সুপ্রিমকোর্টের প্রথম নারী বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা আজ অবসরে গেলেন

145
Justice Nazmun ara
সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের নারী বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা

ঢাকা,বৃহস্পতিবার ৬ জুলাই,২০১৭:সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের নারী বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা দেশের বিচারবিভাগের ইতিহাসে প্রথম নারী বিচারক হিসিবে আজ অবসরে গেলেন।বাংলাদেশের বিচারবিভাগের ইতিহাসে প্রথম নারী বিচারক ও বিচারপতির বর্ণ্যাঢ্য বিচারিক জীবন অবসরের মাধ্যমে শেষ হলো।আজ বৃহস্পতিবার তার ছিলো তার শেষ কর্মদিবস। কাল ৭ জুলাই শুক্রবার তার বয়স ৬৭ বছর পূর্ণ হওয়ায় সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের অবসরের বয়সসীমা অনুযায়ি তিনি অবসরে যাবেন। আজ বৃহস্পতিবার ৬ জুলাই সকাল সাড়ে ১১টায় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার এজলাস কক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির দেয়া সংবর্ধনা সভায় বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা বলেন,আল্লাহ’র পরেই ন্যায় বিচারকের স্থান। জেনে শুনে ভুল বিচার করলে তা হবে মহাপাপ। আইনজীবীদের সহায়তা ছাড়া বিচারকদের সঠিক বিচার করা কঠিন হয়ে যায়। বিচারক হিসেবে আমার যা-কিছু অর্জন তার সবই আইনজীবীদের কাছ থেকেই হয়েছে।
আজ দেশের নিম্ন ও সর্বোচ্চ আদালতে প্রথম নারী বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার অবসর যাওয়ায পূর্বে তার শেষ কর্মদিবসে এটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির দেয়া সংবর্ধনার জবাবে বলেন দেশের প্রথম নারী বিচারক হিসেবে যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হতাম, তাহলে আজ দেশে চারশো নারী বিচারক তৈরি হতো না।তিনি বলেন, আল্লাহ আমাকে বিচারক বানিয়েছেন, তা না হলে আমার বিচারক হওয়া সম্ভব হতো না। আমি কখনো জেনে শুনে ও বুঝে ভুল বিচার করিনি। সব সময় সততা নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সঙ্গে বিচার কাজ সম্পন্ন করেছি। বিচারিক ক্ষেত্রে দেয়া রায়ে অনেকে সংক্ষুব্ধ হয়ে আপিল বিভাগে গিয়েছেন, আপিল বিভাগ ওই রায়ের ওপর পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। শেষ কর্মদিবসে বিদায়ী বক্তৃতায় বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা তার দীর্ঘ ৪২ বছরের বিচারিক জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
আজ আপিল বিভাগের ১ নম্বর বিচার কক্ষে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতিগণ, সিনিয়র আইনজীবীসহ সুপ্রিমকোর্টের কয়েকশত আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।
এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা তার প্রজ্ঞা, মেধা ও সততা দিয়ে বিচার বিভাগকে সমৃদ্ধ করেছেন। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় তার প্রচেষ্ঠা অব্যাহত ছিলো। সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী
সমিতির সভাপতি এডভোকেট জয়নুল আবেদিন বলেন, বিচার কাজে দক্ষ, সৎ ও ন্যায়পরায়ণ বিচারক হিসেবে তিনি সুনাম অর্জন করেছেন। বিচারবিভাগে তার অবদান দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
বক্তরা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার ৪২ বছরের বর্ণাঢ্য বিচারিক জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার স্বামীর নাম কাজী নুরুল হক। দুই ছেলে সন্তানের মা তিনি। বড় ছেলে কাজী সানাউল হক উপল আর ছোট ছেলে এহসানুল হক সূর্য। কাজী সানাউল হক উপল থাকেন অষ্ট্রেলিয়ায়। বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ১৯৭৫ সালের ২০ ডিসেম্বর মুন্সেফ হিসেবে (সহকারী জজ) নিয়োগ পান। ওই নিয়োগের মধ্য দিয়েই তিনি দেশের প্রথম নারী বিচারক হিসেবে বিচার বিভাগে যোগদান করেন। পদোন্নতি পেয়ে ১৯৯০ সালের ২০ ডিসেম্বর হন জেলা জজ। জেলা জজ হিসেবে যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে তিনি ২০০০ সালের ২৮ মে হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। এর দুই বছর পর ২০০২ সালের ২৮ মে তাকে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ২০১১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগেও দেশের প্রথম নারী বিচাপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় তাকে। দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর আগামীকাল শুক্রবার ৭ জুলাই-২০১৭ থেকে তিনি অবসরে যাচ্ছেন। বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায়দানকারী বেঞ্চের বিচারপতি ছিলেন। তিনি নারী বিচারকদের সংগঠন বাংলাদেশ উইমেন জাজেস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। আন্তর্জাতিক নারী আইনজীবী সংস্থায় দু’বার সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আমেরিকা, চীন, ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, ইতালি, জাপান, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মেলনে অংশ নেন এ বিচারপতি।
বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ১৯৫০ সালের ৮ জুলাই মৌলভীবাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা প্রয়াত চৌধুরী আবুল কাশেম মইনুদ্দিন ও মাতা বেগম রাশিদা সুলতানা দ্বীন। তার মা ছিলেন ময়মনসিংহ রাঁধাসুন্দরী গার্লস হাই স্কুলের শিক্ষিকা। বিচারপতি নাজমুণ আরা সুলতানা ময়মনসিংহ সদরের বিদ্যাময়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে মেট্রিক,১৯৬৭ সালে মুমিনুন্নেসা উইমেন্স কলেজ থেকে আইএ পাস করেন।তিনি ১৯৬৯ সালে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন আনন্দ মোহন কলেজ থেকে। ময়মনসিংহ ল’ কলেজ থেকে ১৯৭২ সালে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ওই বছরই জুলাইয়ে ময়মনসিংহ জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে আইন পেশা শুরু করেন। অনুষ্ঠানে আপীল বিভাগের বিচারপতিগণ, সিনিয়র আইনজীবীসহ বারের কয়েকশত আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।