সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় নায়করাজ রাজ্জাকের বিদায়!

82
 hero Razzak.
বাংলা চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক
ঢাকা,মঙ্গলবার ২২ আগস্ট, ২০১৭:বাংলা চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ১৩ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। বয়সী বাঙালীর প্রিয় অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক বেশ কিছুদিন ধরে নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। গতকাল সোমবার বিকেলে কার্ডিয়াক এ্যাটাক হলে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।কিংবদন্তি অভিনেতা নায়ক রাজ-রাজ্জাক ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতার টালিগঞ্জের নাগতলায় জম্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আকবর হোসেন এবং মাতার নাম নিসারুন নেস। রাজ্জাকের তিন ভাই তিন বোন তাদের মধ্যে তিনি ছোট।তিনি ১৯৬২ সালে খায়রুন নেসাকে (লক্ষ্মী) বিয়ে করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি ঢাকায় আগমন করেন। পুত্র বাপ্পারাজ এবং স্ত্রী খায়রুন নেসাকে নিয়ে কলমাপুর বসতি স্থাপন করেন।তিনি সর্বপ্রথম কলকাতার শিলালিপি নামে একটি ছবিতে অভিনয় করেন। ঢাকায় আসার পর রাজ্জাক নায়ক হিসাবে প্রথম বেহুলা ছবিতে অভিনয় করেন। তার সর্বপ্রথম প্রযোজিত ছবি আকাঙ্খা এবং পরিচালক হিসাবে প্রথম ছবি অনন্ত প্রেম, এই পর্যন্ত তার অভিনীত মোট ছবির সংখ্যা প্রায় ৫০০।রাজ্জাকের সেরা প্রাপ্তি ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত হওয়া।আজ সকাল সাড়ে দশটার দিকে এফডিসিকতে নিয়ে যাওয়া হয় নায়ক রাজ্জাকের মরদেহ।সেখানে চলচ্চিত্র অঙ্গনের শিল্পী ও কলাকুশলীরা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানান।তাঁর মৃত্যুতে তিনদিনের শোক ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি। চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি যতটা দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছেন সেটি অনেকটা বিরল।
 hero Razzak.
বাংলা চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ১৩ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
১৯৬০’র দশক থেকে শুরু করে প্রায় তিন দশক বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে দাপটের সাথে টিকে ছিলেন নায়ক রাজ্জাক।১৯৬৬ সালে বেহুলা ছবিতে লক্ষীন্দরের চরিত্রে নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন রাজ্জাক। সেই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন আমজাদ হোসেন।মি: রাজ্জাকের কথা মনে করে আমজাদ হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন “যে সময়ে রহমান সাহেবের পা ভেঙে গেছে, নায়কের অভাব। ঠিক ওই মুহুর্তে রাজ্জাকের আবির্ভাব ও দর্শকও তাঁকে লুফে নিলো। যার জন্য বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এগিয়ে গিয়েছিল তাঁর নাম রাজ্জাক”।”যেমন বম্বেতে দিলিপ কুমার- পশ্চিবঙ্গে উত্তম কুমার, আর ঢাকার চলচ্চিত্র পেয়েছিল নায়ক রাজ্জাককে। প্রায় ৫০ বছর ধরে তিনি চলচ্চিত্র শিল্পে কাজ করছেন রাজ্জাক। ২০১৫ সালেও তার অভিনীত একটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল।রাজ্জাকের সাথে এক সময় বাংলাচলচ্চিত্রে অভিনয় করেন নায়ক ফারুক। বয়সের বিবেচনায় রাজ্জাক ফারুকের সিনিয়র হলেও চলচ্চিত্রে তারা অনেকটা সমসাময়িক ছিলেন। ফারুক বলেছেন,এ ভাগ্যবান মানুষটি তার জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড কাজে লাগিয়েছেন। তিনি যখন বাংলা সিনেমায় অভিনয় শুরু করলেন তখন উর্দু সিনেমার বেশ চাহিদা ছিল।
 hero Razzak.
এফডিসিতে শেষবারের মতো বাংলা চলচ্চিত্রের সদ্য প্রয়াত খ্যাতনামা নায়ক রাজ্জাককে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন চলচ্চিত্রাঙ্গনের ব্যক্তিবর্গে।
বিএফডিসির প্রধান ফটক থেকে শুরু করে ভেতরের পুরো চত্বর ছিল লোকে লোকারণ্য। সকাল থেকে শুরু হওয়া মুসলধারে বৃষ্টির পর রৌদ্রের প্রচন্ড প্রখরতাও দমিয়ে রাখতে পারেনি নায়করাজের ভক্তদের। চলচ্চিত্রাঙ্গনের ব্যক্তিবর্গের পাশাপাশি উৎসুক মানুষের ভিড়ে পুরো এলাকায় তিল ধারনের জায়গা ছিলনা। সবাই প্রিয় অভিনেতা, প্রিয় মানুষ, নায়করাজ রাজ্জাককে এক নজর দেখার জন্য যেন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। সবার মুখে বিষন্নতার ছাপ। অনেকে কেঁদে ফেলেন। পুরো এলাকাজুড়ে পুলিশি নিরাপত্তা বেষ্টনি। অনেকে প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতে না পেরে বাইরে অবস্থান নেয়।বেলা ১১টার দিকে প্রয়াত নায়কের মরদেহ বহনকারী গাড়ী এসে পৌঁছায় এফডিসিতে। সঙ্গে ছিলেন প্রয়াত রাজ্জাকের বড় ছেলে চিত্রনায়ক বাপ্পা রাজ ও সম্রাট। সেখানে গাড়ীর খোলা দরজার ফাক দিয়েই এক নজর দেখা এবং একে একে শ্রদ্ধা জানায় বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ। এখানে তথ্য মন্ত্রনালয়, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি), বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি, চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতি, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিবার, সিনেম্যাক্স মুভি পরিবার, বাংলাদেশ আওয়ামী সাংস্কৃতিক লীগ, বাংলাদেশ ফিল্ম ক্লাব, চলচ্চিত্র গ্রাহক সংস্থা, চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি, সিনে স্থির চিত্রগ্রাহক সমিতি, জাসাসসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শেষ শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয়। অন্যান্যের মধ্যে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, অভিনেতা সৈয়দ হাসান ইমাম, চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক ও গীতিকার মাজহারুল আনোয়ার, অভিনেতা আলমগীর, চিত্রনায়িকা ববিতা, শাবনূর, নায়ক শাকিব খান, অবিনেতা সুব্রত, আলীরাজ, রুবেল, ফেরদৌস, আহম্মদ শরিফ, ওমর সানি, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি অভিনেতা মিশা সওদাগর ও সাধারণ সম্পাদক নায়ক জায়েদ খানসহ শ্রদ্ধা জানান।
Babita
এফডিসিতে নায়ক রাজ্জাকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসেন ববিতা।
এখানে প্রথম নামাজে জানাজায় শরিক হন শিল্পী কলা-কুশলিরা। জানাজার আগে রাজ্জাকের বড় ছেলে বাপ্পারাজ বলেন, আমার আব্বা সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন। সবাই তার জন্য দোয়া করবেন। তার আত্মা যেন শান্তিতে থাকে।তথ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনের পথিকৃৎ রাজ্জাক ভাইয়ের অবদান ভাষায় ব্যক্ত করা যাবে না। শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি চলচ্চিত্র নিয়ে ভেবেছেন। আমরা সরকারিভাবে তার এই কর্মকান্ডকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করব। যাতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তার থেকে শিক্ষা নিতে পারে। আমি তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।ববিতা বলেন, হঠাৎ এই সংবাদটা শোনার পর কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তার সঙ্গে অনেক ছবিতে জুটিবদ্ধ হয়ে কাজ করেছি। সব স্মৃতি ভেসে উঠছে একে একে। আমি কিছুতেই মানতে পারছি না নায়করাজ আর নেই। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুন।আলমগীর বলেন, আমার বলার কিছুই নাই। পিতা হারালে সন্তানের যেমন লাগে আমারও তেমন লাগছে।শাকিব খান বলেন, এখনকার প্রজন্ম এবং আগামী যত প্রজন্ম আসবে তাদের কাছে নায়ক রাজ রাজ্জাক প্রেরণা হয়ে থাকবেন। আমরা একজন আইডল হারালাম। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।ওমর সানী বলেন, নায়ক রাজ রাজ্জাককে আমরা অনেক অবেলায় হারালাম। তার আরো অনেক কিছু দেয়ার ছিলো চলচ্চিত্রকে। তরুণ প্রজন্মের আইডল হিসেবে তিনি আজীবন বেঁচে থাকবেন।
Film-family
এফডিসিতে নায়ক রাজ্জাকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসেন চলচ্চিত্র অঙ্গনের শিল্পীরা।
বাংলা চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাস্ট্রপতি, প্রধান মন্ত্রী ও খালেদা জিয়া।খ্যাতিমান এই অভিনেতার মৃত্যুতে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও শোক প্রকাশ করেছেন। রাজ্জাকের পরিবারের প্রতি তিনিও সমবেদনা জানিয়েছেন।