রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধ ও শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে হবে:প্রধানমন্ত্রী

494
Sheikh Hasina Rehana
গতকাল দুপুরে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার জেলার উখিয়া কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে মায়ানমার থেকে আশ্রয়ের জন্য আসা জনগণের মধ্যে ত্রাণসমাগ্রী বিতরণ করেন।
উখিয়া, কক্সবাজার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ :গতকাল দুপুরে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার জেলার উখিয়া কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে মায়ানমার থেকে আশ্রয়ের জন্য আসা জনগণের মধ্যে ত্রাণসমাগ্রী বিতরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী শরণার্থীদের হাতে নিজে ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন। এ সময় শরণার্থীরা তাদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীকে পেয়ে মায়ানমারে তাদের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের বর্ণনা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী দুর্গত নারী ও শিশুকে কাছে টেনে নেন। সেখানে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা শরণার্থীদের নাম, ঠিকানা, পরিচয় লিপিবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যাতে তাদের কোন সমস্যা হলে আমরা দেখভাল করতে পারি এবং তাদের দেখভাল করাটা আমাদের দায়িত্ব।
Sheikh Hasina
কক্সবাজার জেলার উখিয়া কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে মায়ানমার থেকে আশ্রয়ের জন্য আসা জনগণের মধ্যে ত্রাণসমাগ্রী বিতরণকালে এক রোহিঙ্গা শিশুকে আদর করছেন প্রধানমন্ত্রী।
এসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, রাখাইনের জাতিগত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগণের ওপর অমানবিক আচরণ এবং অন্যায়-অত্যাচার বন্ধ করতে হবে। একই সাথে তিনি বাংলাদেশে অবস্থানকারি শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে প্রতিবেশী মায়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ নেপিডো’র সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায় তবে কোন অন্যায়-অবিচার সহ্য করবে না।প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শান্তি এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই। আমরা কোন ধরনের অন্যায়-অত্যাচার গ্রহণ বা মেনে নিতে পারি না এবং এই ব্যাপারে আমাদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে। প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং প্রত্যেকের কাছে তাঁর সান্ত¦নার বাণী পৌঁছে দেন। তাঁর বোন এবং বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।
Sheikh Hasina
গতকাল দুপুরে কক্সবাজার জেলার উখিয়া কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে
বিদেশী প্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী,মায়ানমার থেকে আশ্রয়ের জন্য আসা শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণসমাগ্রী বিতরণ করেন।
শরণার্থীদের জন্য সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী রাখাইন সম্প্রদায়ের জনগণের প্রতি অত্যাচার বন্ধ এবং বাংলাদেশ থেকে মায়ানমারের শরণার্থীদের দেশে ফেরত নিয়ে যাবার জন্য মায়ানমারের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ অব্যাহত রাখার আহবান পুনর্ব্যক্ত করেন।প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা মায়ারমারের শরণার্থীদের পাশে আছি এবং তাদের সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাব, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা তাদের নিজ দেশ মায়ানমারে ফিরছে। আমরা তাদের পাশে আছি।’মায়ানমারের শরণার্থীদের দুরাবস্থা দেখার পর অন্তরের অন্তস্থলে গভীর দুঃখ অনুভব করছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারাও মানুষ এবং মানুষ হিসেবেই তাদের বাঁচার অধিকার রয়েছে। তারা কেন এত দুঃখ কষ্ট ভোগ করবে?’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই রাখাইন সম্প্রদায়কে তাদের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করার মায়ারমারের কোন অধিকার নেই। তাদেরকে মায়ানমার সরকারের নিরাপত্তা দিতে হবে। যাতে নিজেদের দেশে তারা নিরাপদে বসবাস করতে পারে।’এই বিষয়ে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ মায়ানমারকে সবধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কিন্তু আগে তাদের এই রাখাইন জনগণের প্রতি অন্যায়-অত্যাচার বন্ধ করতে হবে।তাঁর সরকার প্রয়োজনীয় খাদ্য এবং জরুরি সেবা শরণার্থীদের জন্য অব্যাহত রাখবে।প্রধানমন্ত্রী মায়ানমারে সৃষ্ট সংঘাত প্রসঙ্গে বলেন,বার বার আমরা দেখতে পাচ্ছি কিছু মানুষ কোন কোন জায়গায় এক একটা ঘটনা ঘটায়। তারাতো ঘটনা ঘটিয়েই চলে যায়। আর ভ’ক্তভোগী হতে হয় ছোট্ট শিশু, নারী আর সাধারণ মানুষজনদের। তিনি বলেন, মায়ানমার সরকারকে আমি বলব, তারা যেন এই নিরীহ মানুষগুলোর ওপর কোনরকম নির্যাতন না করে। এগুলো যেন তারা বন্ধ করে প্রকৃত দোষী যারা তাদের খুঁজে বের করে। আর এটি করার জন্য আমরা প্রতিবেশী দেশ হিসেবে যা যা সাহায্যের দরকার, আমরা তা করবো।সরকার প্রধান বলেন, আজকে হাজার, হাজার, লাখ, লাখ মানুষ ঘর-বাড়ি ছাড়া হয়ে চলে এসেছে। মায়ানমারে এখনো আগুন জ্বলছে। সেখানে এখনো অনেকে আপনজনের হদিস পাচ্ছে না। নাফ নদীতে ছোট্ট শিশুর লাশ ভেসে বেড়াচ্ছে। মানুষের লাশ ভাসছে-এটা সম্পূর্ণ মানবতাবিরোধী কাজ। সাধারণ শিশু, নারী, পুরুষ সাধারণ মানুষেরা কি অপরাধ করেছে যে, তাদের ওপর এই জুলুম-অত্যাচার। এই ধরণের কর্মকান্ড আমরা কখনই সমর্থন করতে পারি না।
Sheikh Hasina
প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে মায়ানমার থেকে আশ্রয়ের জন্য আসা শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণসমাগ্রী বিতরণ করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা মায়ানমার সরকারকে বারবার বলেছি- আমাদের তরফ থেকে একটা কথা বলেছি যে, সেই ’৭৮ সাল থেকে মায়ানমারে একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে আর মানুষ এখানে এসে আশ্রয় নিচ্ছে। এদের ভোটের অধিকার, নাগরিক অধিকার-সব কেড়ে নেয়া হয়েছে। কেন এই অত্যাচার। এরাতো মায়ানমারেরই লোক। মায়ানমারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীতো নিজেই ঘোষণা দিয়েছিলেন- এই রোহিঙ্গারা তাদেরই নাগরিক। তাহলে এখন তারা এই সমস্যা সৃষ্টি করছে কেন? প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এটুকুই বলবো এ ধরনের ঘটনা। বিশেষ করে এটি একটি অমানবিক ঘটনা, এটি মানবাধিকারের লঙ্ঘন। প্রতিবেশি দেশ আমরা। সেখানে কোন ঘটনা ঘটলে আমাদের ওপর চাপ পড়ে। তিনি বলেন, এই যে মানুষ আজকে এখানে এসেছে- আমরা মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদেরকে এখানে আশ্রয় দিয়েছি। কারণ স্বজন হারাবার বেদনাটা যে কি সেটা আমরা জানি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে যদি সকলের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা সরকার বিধান করতে পারে সেক্ষেত্রে মায়ানমারের শরণার্থীদেরও কোন সমস্যা হবে না।
এই বার্তাও প্রধানমন্ত্রী আগত রোহিঙ্গাদের উদ্দেশ্যে দেন- এইখানে কোন স্বার্থান্বেষী মহল যদি ফায়দা লোটার চেষ্টা করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সুতরাং বিচ্ছিন্নভাবে হলেও কেউ যেন এ ধরনের কোন অপচেষ্টার সাথে লিপ্ত না হন। সে ব্যাপারেও প্রধানমন্ত্রী সকলকে সতর্ক করে দেন।এলাকাবাসীর প্রতি তিনি আহবান জানিয়ে বলেন, এই সব আশ্রিত জনগণের সঙ্গে কোন অস্থির বা অমানবিক আচরণ করা যাবে না। সহনশীলতার সঙ্গে এবং মানবতার সঙ্গে যেন তারা এইসব মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা বিবেচনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর এবং শেখ রেহানার কথা উল্লেখ করে বলেন, আমরা দুটি বোন ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট মা, বাবা, ভাই সব হারিয়ে আমাদেরকেও রিফিউজি হিসেবে বিদেশে থাকতে হয়েছে। আমার মনে পড়ে ১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আমাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করেছিল তখন আমাদের দেশের মানুষ ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো। এভাবেই ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল হানাদার বাহিনীরা। আমাদের নিজের ঘর, আমার দাদার বাড়ি, নানার বাড়ি এবং আমাদের আত্বীয়-স্বজনদের বাড়িঘর, আমাদের গ্রাম পুরো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করা হয়েছিল। আজকের যারা নতুন প্রজন্ম তারা পাকিস্তানী বাহিনীর সেই বর্বর অত্যাচার-নির্যাতন দেখেনি। কিন্তু আমরা যারা দেখেছি তারা স্মরণ করতে পারি কি ভয়াবহ তা ছিল। তাই এই শরনণর্থীদের প্রতি আমি সকলকে সদয় হতে বলব। মানবতার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহবান জানাবো।
আন্তর্জাতিক অনেক সংস্থাই আজ মায়ানমারের শরণার্থীদের সহায়তার জন্য এগিয়ে এসেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা একটি রিলিফ কমিটি গঠন করে তাঁর মাধ্যমে ত্রাণ সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছি। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, স্থানীয় প্রশাসন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সহযোগিতার হাতকে প্রসারিত করেছেন।
সরকার বায়মেট্রিক রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে রিলিফ তৎপরতা চালিয়ে যাবার উদ্যোগ নিয়েছে ।
অনুষ্ঠানে,বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জ্বল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, হুইপ ইকবালুর রহিম, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মুহম্মদ শফিউল হক এবং শেখ রেহানার পুত্রবধু এবং সিনিয়র আইএমও কর্মকর্তা পেপী সিদ্দিক সহ স্থানীয় সাংসদ এবং জনপ্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।সূত্রঃবাসস।