রাজধানী ঢাকায় রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট,চুলা জ্বলছেইনা

325

রাজধানী ঢাকায় মাসখানেক ধরে বিভিন্ন জায়গায় রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে।সারাদেশে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দেয়ায় বাসাবাড়িতে গ্যাসের চুলা প্রায় বন্ধ বললেই চলে।সারা দিন গ্যাস থাকে না,রাতে বারোটার দিকে ঘুমোবার সময় গ্যাস আসে,আবার ভোর ছয়টা হতে না হতেই গ্যাস চলে যায়।তাই রাজধানী বাসীকে রাত জেগে রান্না করতে হয়।শীতকাল এলে প্রতিবছরই এ সমস্যা হয়, কিন্তু এবার মাসখানেক ধরে এই গ্যাস সংকট খুব বেশি রকম বেড়ে গেছে।গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকার বিভিন্ন জায়গার সিএনজি ফিলিং স্টেশন গুলোতেও গ্যাসের তীব্র সংকট দেখাদিয়েছে।বাসাবাড়িতে আবাসিকে দিনের বেলায় চুলা জ্বালানোই দায়,শিল্প-কারখানায় গ্যাসের চাপ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।অন্যদিকে সিএনজি ফিলিং স্টেশন গুলোতে শত শত গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে গ্যাসের জন্য।কিন্তু তীব্র সংকটের কারনে ঠিকমত গ্যাসে পাওয়া যাচ্ছে না।শুধু রাজধানী ঢাকায় নয়, গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরেও।গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ পড়েছে বিপাকে।অনেক বাসায় উনুনই জ্বলছে না।শীত মৌসুম শেষ হওয়ার আগে গ্যাস সংকট দূর হওয়ার আশা নেই।সার কারখানায় গ্যাস দেওয়া বন্ধ হলেও অন্তত আড়াই হাজার শিল্প-কারখানা বসে আছে গ্যাসের সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির জন্য।এসব শিল্পে গ্যাস সংযোগ ও গ্যাসের লোড বৃদ্ধি করা হলে গ্যাসের সংকট শিগগিরই দূর হবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার পেছনে জোগানের চেয়ে বেশি চাহিদাকে দায়ী করছেন দেশের সর্ববৃহৎ গ্যাস বিতরণকারী সংস্থা তিতাসের কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিদিন তিতাস অঞ্চলে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে প্রায় এক হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট।তবে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের অঞ্চলে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ১৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।বিপরীতে সরবরাহ রয়েছে ১৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।জোগানের চেয়ে চাহিদা বেশি থাকার কারণেই গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া শীত মৌসুমে  গ্যাসের পাইপলাইনে গ্যাসের সহজাত উপাদান কনডেনসেট জমে যায়।এতে গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়।বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা রয়েছে তিন হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট।আর এখন সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে দুই হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট।ফলে সারা দেশেই গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে।তিতাস এলাকায় প্রয়োজন এক হাজার ৮০০ থেকে ১৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।এর বিপরীতে বর্তমানে পেট্রোবাংলা তিতাসকে সরবরাহ করছে প্রায় ১৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদামতো গ্যাস না পাওয়া পর্যন্ত তিতাস এলাকায় সংকট কাটবে না।  ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিক হারে কমে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। জানা গেছে, বসুন্ধরা,রামপুরা, ছোলমাইদ, উত্তরা, বাড্ডা, পূর্ব বাসাবো,রাজধানীর কাজীপাড়া, তেজকুনিপাড়া, নাখালপাড়া, তেজগাঁও, কাফরুল, পূর্ব ও পশ্চিম শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মিরপুরের বিভিন্ন সেকশন, সেনপাড়া পর্বতা, কল্যাণপুর, ধানমণ্ডির রায়েরবাজার, নূরজাহান রোডসহ পুরো মোহাম্মদপুরেও তীব্র গ্যাস সংকট বিরাজ করছে।মোহাম্মদপুর, পশ্চিম ধানমণ্ডির রায়েরবাজার এলাকা ও হাজি আফসারউদ্দিন রোড, জিগাতলার মনেশ্বর রোড ও ট্যানারি মোড় থেকে তল্লাবাগ এলাকা, পুরান ঢাকার লালবাগ, মিরপুর অঞ্চলের রূপনগর, শ্যামলী রিংরোড, মোহাম্মদপুরসহ বহু এলাকায় গতকালও গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে।বিশেষ করে রাস্তার শেষ প্রান্তের বাড়িগুলোতে রাত ১০টার আগে গ্যাস আসে না।

সরকার গত বছরে প্রায় ৩৫০ শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংযোগ দিয়েছে।বিবিয়ানা-২-এ ৩৫০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন শুরু হয়েছে।আশুগঞ্জের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে সরকার।এ ছাড়া সিলেটের শাহজালাল সার কারখানা, ঘোড়াশাল ও পলাশ সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ ফের চালু হয়েছে। এতে সব মিলিয়ে শুধু তিতাস এলাকায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে।শীতের সময় গ্যাসের উপজাত কনডেনসেট গ্যাসের পাইপলাইনে জমাট বেঁধে যায়। এতে গ্যাস সঞ্চালনের গতি কমে যায়। এ ছাড়া শীতের সময় গ্যাসের ব্যবহারও বেশি হয়। ফলে শীত এলেই গ্যাসের কিছুটা সংকট দেখা দেয়।এ ছাড়া  বাখরাবাদ-সিদ্ধিরগঞ্জ গ্যাস লাইনটি বন্ধ রাখা হয়েছে। কারণ এ পাইপলাইনে মাত্রাতিরিক্ত বালু ও কনডেনসেট জমেছে। এসবের পাশাপাশি গ্যাসের পর্যাপ্ত মজুদ না থাকায় নির্বিঘ্ন গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাও শঙ্কার মধ্যে পড়েছে।শীত শেষে পাইপলাইনে কনডেনসেট ও বালু কমে আসবে বলে জানায় পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগ। তবে এবারের সংকট অন্যবারের চেয়েও তীব্র হওয়ায় এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে মিলেছে ভিন্ন তথ্য। এবারের তীব্র গ্যাস সংকটের পেছনে শীতই একমাত্র দায়ী নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগ জানায়, অসংখ্য অবৈধ সংযোগ রয়েছে শিল্প-কারখানায়। এর ফলে হিসাবের বাইরে গ্যাস চলে যাচ্ছে এসব শিল্প-কারখানায়। এ ছাড়া গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জের বাসাবাড়িতে হাজার হাজার অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে।গ্যাসের এই চাহিদার সবটা জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলেই রাজধানী ঢাকা ছাড়াও তিতাস এলাকায় গ্যাসের সংকট তীব্র হয়েছে।পর্যাপ্ত গ্যাসের মজুদ না থাকায় পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি ঘটবে না। সেক্ষেত্রে এখনই পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প ভাবার পরামর্শ দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। তাদের মতে, পাইপলাইনের গ্যাসের পরিবর্তে লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। সিলিন্ডারের গ্যাস ব্যবহারের ওপর এখন থেকেই জোর দিতে হবে।এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, নানা কারণে গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে। তবে মূল কারণ গ্যাসের মজুদ কমছে। দ্রুত পাইপ লাইনের গ্যাসের বিকল্প ভাবতে হবে। এজন্য আমরা এলপিজি গ্যাস ব্যবহারে উৎসাহ বাড়াতে পরিকল্পনা নিয়েছি। আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে এলপিজি ব্যবহারের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা চলছে।