মোহাম্মদ আলী সর্বকালের সেরা মুষ্টিযোদ্ধা ছিলেন

296
 ১৯৭৮ সালে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাথে
১৯৭৮ সালে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাথে

মোহাম্মদ আলী সর্বকালের সেরা মুষ্টিযোদ্ধা ছিলেন। সর্বকালের সেরা মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন। এ দেশকে তিনি ‘বেহেশত’ মনে করতেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন সরকারের সাথে মোহাম্মদ আলীর একটা ঝামেলা হয়। তখন তিনি জানিয়েছিলেন জন্মভূমি যুক্তরাষ্ট্র তাকে তাড়িয়ে দিলে আমার দ্বিতীয় মাতৃভূমি বাংলাদেশেই আশ্রয় নেবেন। সম্প্রতি মোহাম্মদ আলী যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার ফোনিক্স এরিনা হাসপাতালে মারা যান। বিশ্বখ্যাত ও কিংবদন্তি মুষ্টিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলীকে মুসলিম রীতিতে,কোরান পাঠের মধ্য দিয়ে শেষ বিদায় জানানো হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়োছল ৭৪ বছর। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় লুইভিলে মুহাম্মদ আলীকে শেষ বিদায় জানিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। তার নামাজে জানাজায় শরীক হতে সারা বিশ্ব থেকে মুসলমানরা সমবেত হন যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকির লুইসভিলেতে। স্থানীয় সময় বেলা সোয়া ১২টায় লুয়াভিল শহরের ফ্রিডম হলে সর্বকালের অন্যতম সেরা এ ক্রীড়াবিদের জানাজায় অংশ নেন প্রবাসী বাংলাদেশীরাও। তাকে ‘মানবতার প্রতীক’ হিসেবে অভিহিত করে ‘তার কাছ থেকে শেখার’ জন্য বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। সারাবিশ্বের টিভি ও অনলাইনে তার জানাজার নামাজ প্রচারিত হয়। আয়োজকরা বলছেন, মুসলিমদের হিরো হিসেবে বিবেচিত মুহাম্মদ আলীর জানাজায় শরীক হওয়াটাকে অনেকেই বিরল সুযোগ হিসেবে দেখছেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে ইসলামের পথে যাত্রা শুরু করেছিলেন হেভিওয়েট বক্সিংয়ে তিন বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন মুহাম্মদ আলী। গত ৫০ বছর তিনি ছিলেন একজন খ্যাতিসম্পন্ন মুসলিম, বিশেষ করে আমেরিকায়। মুহাম্মদ আলীর মৃত্যুর মাধ্যমে আমেরিকার জনগণ মুসলিমদের সম্পর্কে আরো ভালোভাবে জানার সুযোগ পাবেন বলে আশা করছেন জানাজার আয়োজকরা। প্রথমে তিনি ন্যাশন অব ইসলামে যোগদান করলেও পরে ইসলামের মূলধারা সুন্নী ইসলামে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে তিনি বিশ্বের মুসলিমদের অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত হন। তিনি প্রায় ২০ লক্ষাধিক মানুষকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেন। যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতিমান ইসলামি পণ্ডিত এবং মুহাম্মদ আলীর জানাজায় ইমামতি করা ইমাম জায়েদ শাকির বলেন, ‘ বিশেষ যে কারণে মুহাম্মদ আলী অসংখ্য মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিলেন তা হলো তিনি তার ধর্মবিশ্বাস ও নীতির জন্য তার খ্যাতি, অর্থ, বিত্ত, গ্ল্যামারসহ সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের মসজিদগুলোতে তার জন্য বিশেষ দোয়ার আহ্বান জানানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকির লুইভিলে ওই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষ অংশ নেন। এর আগে পরিবার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের উপস্থিতিতে তাকে দাফন করা হয়। কোরান পাঠ দিয়ে শুরু হয় মুহাম্মদ আলীকে শ্রদ্ধা আর স্মরণের অনুষ্ঠান। এরপর মুসলিম, ক্রিশ্চিয়ান, ইহুদিসহ বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

নামাজরত অবস্থায়  মোহাম্মদ আলী
নামাজরত অবস্থায় মোহাম্মদ আলী

কিংবদন্তি মোহাম্মদ আলী ১৯৭৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সফরে বাংলাদেশ ভ্রমণে আসেন। সপ্তাহব্যাপী এই সফরে সঙ্গী ছিলেন তার স্ত্রী ভেরোনিকা। ঢাকায় আলীর জন্য ব্যাপক সংবর্ধনার আয়োজন করে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়া হয় তাকে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিশ্বখ্যাত বক্সারের হাতে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের সনদপত্র ও পাসপোর্ট তুলে দেন । বাংলাদেশে নাগরিকত্ব পেয়ে আলী বলেন, কখনো জন্মভূমি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেয়া হলে বাংলাদেশ হবে তার থাকার জায়গা। আলীর সম্মানে তৎকালীন ঢাকা (বর্তমান বঙ্গবন্ধু) স্টেডিয়ামে প্রদর্শনী মুষ্টিযুদ্ধের আয়োজন করা হয়। এতে ১২ বছর বয়সী বাংলাদেশী বালক মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনের সঙ্গে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন সর্বকালের সেরা আলী। বাংলাদেশ সফরকালে আলী সুন্দরবন, সিলেট, রাঙামাটি ও কক্সবাজার ভ্রমণ করেন। বাংলাদেশের সৌন্দর্য দেখে বিমোহিত হন আলী। উচ্ছ্বসিত হয়ে বাংলাদেশকে ‘বেহেশত’ আখ্যা দেন তিনি। বিশ্ববাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘বেহেশতে যেতে চাইলে বাংলাদেশে ঘুরে আসুন’! লুইভিলে ১৯৪২ সালের ১৭ই জানুয়ারি খৃস্টান দম্পতি রংমিস্ত্রি ক্যাসিয়াস মারকেলাস ক্লে ও গৃহিনী ওডিসা গ্র্যাডি ক্লের ঘরে জন্ম নেন আলী। বাবা নিজের নামে সন্তানের নাম রাখেন ক্যাসিয়াস মারকেলাস ক্লে জুনিয়র। ক্লে জুনিয়র ১৯৬০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে রোম অলিম্পিকে লাইট-হেভিওয়েটে সোনা জিতে খ্যাতির তালিকায় উঠে আসেন। এরপর ১৯৬৪ সালে ২২ বছর বয়সে তখনকার বিখ্যাত মুষ্টিযোদ্ধা সনি লিস্টনকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেন ক্লে জুনিয়র। এরপর বাকিটা ইতিহাস। তিনিই প্রথম মুষ্টিযোদ্ধা হিসেবে তিনবার বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন হন। এখন পর্যন্ত তার এ রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারেনি। এদিকে প্রথমবার শিরোপা জয়ের পরপরই বোমা ফাটান ক্লে জুনিয়র। খ্রিস্টান এ বক্সার ঘোষণা দেন তিনি ‘নেশন অফ মুসলিম’ গোত্রের সদস্য। এরপর ক্লে জুনিয়রের নাম রাখা হয় ক্যাসিয়াস এক্স।কিন্তু তিনি মনে করতেন তার পদবী দাসত্বের পরিচায়ক। এ কথা জেনে কিছুদিন পর ক্যাসিয়াসের নাম বদলে দিয়ে তার নতুন নাম মোহাম্মদ আলী বলে ঘোষণা দেন ‘নেশন অফ মুসলিম’ প্রধান ডব্লিউ ডি মোহাম্মদ। পরে ১৯৭৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন আলী। ১৯৮১ সালে পেশাদার বক্সিং থেকে অবসর নেওয়ার আগে ৬১টি লড়াইয়ের মধ্যে ৫৬টিতে জেতেন আলী। বড়সর পারিবারিক জীবন ছিল আলীর। তিনি মোট চারটি বিয়ে করেন। তিনি সাত মেয়ে ও দুই ছেলের জনক। তার মেয়ে লায়লা আলী বিশ্বখ্যাত নারী মুষ্টিযোদ্ধা। আলী নিজেকে বলতেন ‘গ্রেটেস্ট’ অর্থাৎ সবার চেয়ে সেরা। রিংয়ে নামার আগে-পরে কথাবার্তাতে ও ছিলেন পটু। তার বিখ্যাত উক্তি ‘প্রজাপতির মত নেচে নেচে মৌমাছির মত হুল ফোটাব’। মোহাম্মদ আলী ছিলেন আধুনিক সময়ের এক অনন্য শক্তিশালী মুসলমান।

মোনাজাতরত  মোহাম্মদ আলী
মোনাজাতরত মোহাম্মদ আলী

যার মুষ্টির আঘাতে যেমন শক্তিমান প্রতিপক্ষরা ধরাশীয় হতো, তেমনি তার বিশ্বাসও ছিল পাহাড়সম উঁচু, যেখানে উগ্রতার চেয়ে শান্তির বাণীই ছিল প্রধান। ১৯৬৬ সালে আমেরিকার হয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করেন আলী। তার সাফ কথা ছিল, কোরআন যুদ্ধ সমর্থন করে না। আল্লাহ বা নবীর নির্দেশ ছাড়া তিনি যুদ্ধে যাবেন না। কোন ভিয়েতকং এর সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নেই। শুধু সাদা চামড়ার মানুষের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য ১০ হাজার মাইল দূরের কোনো দেশে গিয়ে মানুষের ওপর অত্যাচার করা, খুন করা, বোমা ফেলা এই কাজে আমি যুক্ত হব না। পৃথিবীর বুকে এসব অবিচার বন্ধ হওয়া উচিত। এই অবস্থানের জন্য কঠিন মূল্য দিতে হয় আলীকে। তার খেলার লাইসেন্স সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। গ্রেফতারও করা হয় তাকে। তবুও মানবতার বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো কাজ করেননি। মানবতার জন্য সোচ্চার আলী অবসরে যাওয়ার পর জটিল রোগে আক্রান্ত হলেও আমৃত্যু বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা ও অসহায় মানুষের কল্যাণে কাজ করেন। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সফর কররার পরের বছর ১৯৭৯ সালে বিবিসি বাংলার লন্ডন স্টুডিওতে গিয়েছিলেন ছিলেন বিশ্বখ্যাত মুষ্টিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলী।  বিবিসি বাংলার লন্ডন স্টুডিওতে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন সেসময় বিবিসি বাংলার প্রযোজক শ্যামল লোধ। ওই সাক্ষাৎকারের এক অংশে বিবিসি বাংলার শ্রোতাদের বাংলায় অভিনন্দন জানিয়েছিলেন কিংবদন্তী মুষ্টিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলী।