ভারত ফারাক্কা বাঁধের সব গেট খুলে দেয়ায়,বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে!

282
SHEIKH HASINA
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

ঢাকা,সোমবার ২১ আগস্ট, ২০১৭ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন,আওয়ামী লীগ সরকার আপনাদের সরকার,তাই যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জনগণ যাতে অনাকাংখিত সমস্যায় না ভোগে সে জন্য তাঁর সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। কাজেই আওয়ামী লীগ সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে, জনগণকে কোন অনাকাংখিত সমস্যায় ভুগতে হবেনা’।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বিকেলে কুড়িগ্রামের পাংগারানী লক্ষীপ্রিয়া স্কুল এন্ড কলেজ ময়দানে স্থানীয় বন্যা দুর্গতদের মাঝে ত্রাণসমাগ্রি বিতরণের পূর্বে এক সমাবেশে ভাষণ কালে এসব কথা বলেন।তিনি বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় থাকি বা না থাকি, যেকোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমরা আপনাদের পাশে থাকবো’।তিনি বলেন,পরবর্তী ফসল না আসা পর্যন্ত সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বীজ ও অন্যান্য কৃষি সামগ্রী বিনা মূল্যে বিতরণ করবে। তিনি বন্যা দুর্গতদের সাহায্যে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহবান জানান। 

Floods Bangladesh
বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি

দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে।উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢল ও ফাঁরাক্কা বাঁধের গেট খুলে দেওয়ায় নওগা, কুড়িগ্রাম ও বগুড়া জেলার কয়েকটি স্থান নতুন করে বন্যা প্লাবিত হয়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে।উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং মৌসুমী ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে সৃষ্ট বন্যায় বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে অর্ধকোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক সপ্তাহে মৃত্যু হয়েছে অন্ততঃ ৭৭ জনের। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ পর্যন্ত দেশের ২৭ জেলার ১৩৩ উপজেলা ও ৪৩টি পৌরসভা এ বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় ১১ লাখ ৪১ হাজার পরিবারের ৫০ লাখ ১৮ হাজার ৭০৬ জন বানভাসি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে তথ্য পাঠিয়েছেন মাঠ কর্মকর্তারা। চলতি মৌসুমের দ্বিতীয় দফার এ বন্যায় এ পর্যন্ত ছয় লাখ ১৮ হাজার ৭০৯ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও পদ্মায় পানি বাড়ায় অবনতি হচ্ছে দেশের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের কয়েকটি জেলার পরিস্থিতির।সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি এবং উত্তরাঞ্চলের রন্যাকবলিত জেলাগুলোসহ মোট ২০ জেলায় এ পর্যন্ত বন্যার কারণে ২০ জনের প্রাণহানির সত্যতা স্বীকার করে ত্রাণমন্ত্রী এ সংবাদ সম্মেলনে জানান দেশের ২০ টি জেলার ৩৫৬টি উপজেলায় ৯৭৩টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৫৮৬ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।এদিকে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ কমছে না। বন্যায় সড়ক এবং রেল লাইন তলিয়ে যাবার কারণে, বিভিন্ন এলাকাও যোগাযোগও বন্ধ রয়েছে। বাড়িঘর পানিতে ডুবে বা ভেঙে যাবার কারণে গৃহহীন হয়ে বন্যাকবলিত লাখো মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধ, সড়ক বা কোনো আশ্রয় কেন্দ্রে। অনেকেই খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিভিন্ন এলাকায় গবাদিপশুর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।  পানিতে তলিয়ে যাবার কারণে স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছে পানিবাহিত নানা রোগবালাই।

Floods Bangladesh
বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে,ব্রহ্মপুত্র-যমুনার বিভিন্ন পয়েন্টে আগামী ৭২ ঘণ্টায় পানি কমা অব্যাহত থাকলেও গঙ্গা-পদ্মার পানি আগামী ৪৮ ঘণ্টায় বাড়বে।নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, রাঙামাটি, নীলফামারী, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, খাগড়াছড়ি, দিনাজপুর, জামালপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজবাড়ী নওগাঁ, জয়পুরহাট, যশোর, মৌলভীবাজার, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ ও মাদারীপুর জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ এখন বন্যা কবলিত।অন্যদিকে, আগস্টের শেষভাগে ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় তৃতীয় দফা বন্যার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেক্ষেত্রে দুই দফা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের কারণে দুর্ভোগ বহুগুণে বেড়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।এ বছর জুলাই মাসের দ্বিতীয়ার্ধে মৌসুমের প্রথম বন্যায় অন্তত ১৩ জেলার অনেক উপজেলা প্লাবিত হয়। অগাস্টে চলমান বন্যায় ২৭ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে।এর মধ্যে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে ফের বন্যার আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।পদ্মার পানি বাড়ার কারণে মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুরের বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হচ্ছে।  আগস্টের ২৪-২৫ তারিখ থেকে উজানে ফের বৃষ্টি বাড়তে পারে। বাংলাদেশেও বৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে ঈদের আগে থেকে বা সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ থেকে আবার বন্যা দেখা দিতে পারে।

Farrakka Barrage
ভারত গঙ্গার পানি একতরফা প্রত্যাহার করার জন্য বাংলাদেশের প্রায় ১৮ মাইল উজানে গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ নির্মান করে।

এদিকে বাংলাদেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতির জন্য উজানের দেশ ভারতকেই দায়ী করেছে আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি। আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি নিউ ইয়র্ক ও বাংলাদেশ কমিটি গতকাল ঢাকায় আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, এবারের বন্যার জন্য উজান থেকে নেমে আসা পানিই বিশেষ করে ফারাক্কা বাঁধের গেট খুলে দেয়ায় নেমে আসা পানিই মূলতঃ দায়ী। নদী ও পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার ৯২ ভাগ পানিই বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদীর উজানের অববাহিকা থেকে আসে। বাকি ৮ ভাগ পানি স্থানীয় বৃষ্টিপাত থেকে আসে।সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি নিউ ইয়র্কের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান সালু বলেন,নদীগুলোর উজানের অববাহিকায় যথেচ্ছ ড্যাম ও ব্যারেজ নির্মাণের ফলে উপমহাদেশের অনেক নদী মরতে শুরু করেছে। কেবলমাত্র বাংলাদেশের গঙ্গাবিধৌত অঞ্চলেই ৩০টি নদীর অকাল মৃত্যু ঘটেছে। আবার নতুন নতুন চর জেগে উঠায় বর্ষায় যথেষ্ট পানি ধারণ করে সাগরে বয়ে নিতে না পারায় নদীর দু’তীর উপচে বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। অপরদিকে শুকনো মৌসুমে পানির অভাবে মরুকরণ দেখা দিচ্ছে। দেখা দিয়েছে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়।আতিকুর রহমান সালু আরো বলেন, তিস্তার পানি এখন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ওপারে মহানন্দা ও গঙ্গা নদী দিয়ে আরো দক্ষিণে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর তিস্তা নদীকে বাংলাদেশে মেরে ফেলা হচ্ছে। অপরদিকে,  ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রবাহ তার স্বাভাবিক গতিপথ থেকে সরিয়ে নিতে ভারত যে আন্তঃনদী সংযোগ মহাপরিকল্পনা নিয়েছে তা বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশ আর নদীমাতৃক থাকবে না। তাই সমন্বিত, টেকসই ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় নদীগুলো বাঁচিয়ে রাখতে হবে।সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক জসিম উদ্দিন আহমাদ বলেন, এ বন্যা মানব সৃষ্ট। শুকনো মৌসুমে সব স্লুইস গেট বন্ধ করা ও বর্ষা এলে খুলে দেয়া হচ্ছে। উজানে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশে আরো কয়েকদিনের বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে এবার ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের মতো ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।পশ্চিমবঙ্গের সেচমন্ত্রী রাজীব বন্দোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘মূলত নেপাল ও বিহার থেকে উচ্চ মাত্রার পানি প্রবাহের কারণেই তার রাজ্যে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

Farrakka Barrage
ভারত গঙ্গার পানি একতরফা প্রত্যাহার করার জন্য বাংলাদেশের প্রায় ১৮ মাইল উজানে গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ নির্মান করে।