‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম আর নেই

331
বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম
বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম

উপমহাদেশের নারীদের প্রথম সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম নূরী ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আজ সোমবার সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন নূরজাহান বেগম। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৯১ বছর। গত ৪ মে বুকে শ্বাসকষ্ট দেখাদিলে তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত শনিবার ৭ মে দুপুরে তার অবস্থার অবনতি হয়। পরে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নিয়ে ‘লাইফ সাপোর্টে’ রাখা হয়েছিল। তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে ভ্যান্টিলেশন দেয়া হয়। নূরজাহান বেগম চাঁদপুর জেলার চালিতা তলীতে ১৯২৫ সালের ৪ জুন জন্মগ্রহণ করেন। নূরজাহান বেগমের মায়ের নাম ফাতেমা বেগম। নূরজাহান বেগমের বাবা নাসির উদ্দিন একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক ছিলেন। তিনি পিতামাতার একমাত্র সন্তান ছিলেন। তার পরিবার ১৯২৯ সালে গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় চলে আসে। ১৯৪২ সালে বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল হাইস্কুল থেকে তিনি মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। নূরজাহান বেগম ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে পড়াশুনা করে বি এ পাশ করেন। কৈশোরে কলকতায় বেগম পত্রিকার সাথে পরিচয় গড়ে উঠে সাংবাদিক কামাল লোহানীর। তিনি বলেন তখনকার সমাজে মুসলিম নারী লেখক তৈরীতে বেগম পত্রিকার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। সাহিত্যক্ষেত্রে বিশেষ করে মুসলমান পরিবারের মেয়েদের এগিয়ে নেবার লক্ষ্যে ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই কলকাতা থেকে বেগম পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তৎকালীন সওগাত পত্রিকার সম্পাদক নাসির উদ্দিন। বেগম পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। তার সাথেই কাজ করতেন নাসির উদ্দিনের একমাত্র কন্যা নূরজাহান বেগম।

‘সওগাত’ পত্রিকার দপ্তর
‘সওগাত’ পত্রিকার দপ্তর

‘সওগাত’ পত্রিকার দপ্তর ১১ নম্বর ওয়েলসলি স্ট্রিটের দোতলা বাড়িতেই তারা থাকতেন। এই অফিসেই নিয়মিত সাহিত্য মজলিস বসত। যেখানে কাজী নজরুল ইসলাম, খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন, আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, হবীবুল্লাহ বাহার, ইব্রাহীম খাঁ, কাজী মোতাহার হোসেনসহ বহু বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব অংশ নিতেন। এই সাহিত্য মজলিসের নিয়মিত শ্রোতা হয়ে ওঠেন নূরজাহান বেগম নূরী। তারা তাকে নূরী বলেই ডাকতেন। এই ব্যক্তিবর্গ নূরীর মানস গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে বলে পরিণত নূরজাহান বেগম বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করেন। বেগম পত্রিকা শুধু নারীদের উদ্দেশ্যে করেই গোড়াপত্তন হলেও এর পাঠক শুধু নারীরাই ছিলেন না। ধীরে ধীরে এই পত্রিকা পুরুষদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এই বেগম পত্রিকা তৎকালীন সমাজে নারী পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং তাদের জন্য সাংস্কৃতিক বিনোদন দেবার একটি বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। ১৯৬০ এবং ১৯৭০’র দশকে প্রতি সপ্তাহে বেগম পত্রিকার প্রচার সংখ্যা ছিল ২৫ হাজারের মতো। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ডাকযোগে এই পত্রিকা পৌঁছে যেত। কিন্তু বেগম পত্রিকার সে জৌলুস এখন আর নেই।যে সময়টিতে নারীদের ছবি তোলা নিয়ে অনেকের আপত্তি ছিল, সে সময়ে নারীদের জন্য একটি সচিত্র সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করা মোটেও সহজ কাজ ছিল না। তখনকার সমাজে মুসলিম নারী লেখক তৈরীতে বেগম পত্রিকার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ৫০’র দশকে এই বেগম পত্রিকা তৎকালীন সমাজে শিক্ষিত মুসলিম নারী লেখকদের একটি বড় প্লাটফর্ম হয়ে উঠে। কিছুদিন সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পর কবি সুফিয়া কামাল নিজের ব্যস্ততার কারণে কাজ ছেড়ে দিলে নূরজাহান বেগমের হাতে বেগম পত্রিকাটি গড়ে উঠে। নূরজাহান বেগম শুধু উত্তরাধিকার সূত্রে নয়, নিজের মেধা এবং যোগ্যতা দিয়ে তিনি বেগম পত্রিকাকে গড়ে তুলেছেন। ১৯৫২ সালে নূরজাহান বেগমের বিয়ে হয় লেখক, সাংবাদিক ও শিশু সংগঠক রোকনুজ্জামান খানের সাথে। অনেকের কাছেই তিনি ‘দাদাভাই’ নামে পরিচিত ছিলেন।

‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম নূরী
‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম নূরী

নূরজাহান বেগম এমন একটি পত্রিকার ইতিহাস রেখে গেলেন যেটি এ অঞ্চলে বহু নারীকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছে। ভারতবর্ষ বিভক্ত হবার পরে অর্থাৎ পাকিস্তান সৃস্টির পর ১৯৫০ সালে পত্রিকাটি ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। বেগম পত্রিকার ঢাকার নতুন ঠিকানা হয় বর্তমানে পুরনো ঢাকার পাটুয়াটুলিতে। গত ৬৬ বছর ধরে এখানেই আছে বেগম পত্রিকা। ‘নারী শিক্ষা ও নারী উন্নয়নে নূরজাহান বেগমের অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

উপমহাদেশের নারীদের প্রথম সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম নূরী
উপমহাদেশের নারীদের প্রথম সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম নূরী