বাবা-স্বামীকে হত্যা ও আমাকে গণধর্ষণ করে:মোহসিনা

2314
mohasina raped
টেকনাফে আশ্রয় নেয়া মোহসিনা

মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের জাম্বুনিয়া থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের  টেকনাফে আশ্রয় নেয়া মোহসিনা বলছিল,’আমার চোখের সামনে বাবা-চাচা-স্বামীকে হত্যা করা হয়, আমাকে ধর্ষণ করা হয়’ ।  মোহসিনা বেগমের কোলে ছোট একটি শিশু, বয়স চার বছর। শিশুটি খালি গায়ে মায়ের কোলে খেলা করছে। মায়ানমারের আরাকান স্টেটের নামে তিনি শিশুটির নাম রেখেছেন আরকান । টেকনাফের শরণার্থীর থাকার জায়গা লেদা ক্যাম্পে মোহসিনার সাথে দেখা হয় আমার। মলিন পোশাক আর বিধ্বস্ত চেহারার মোহসিনা বলছিলেন গতমাসে ঠিক কি ঘটেছিল মায়ানমারে নভেম্বরের ১২ তারিখ। “সকাল বেলা হঠাত করেই একদল লোক অস্ত্র হাতে তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। বাড়ি ভাংচুর আর আগুন। বাড়ির পুরুষ, মহিলা শিশু সবাইকে আলাদা করে দাঁড় করানো হয়।” মায়ানমারের রাখাইনের জাম্বুনিয়া এলাকায় বাড়ি মোহসিনার। মোহসিনা বলছিলেন “পুরুষদের আলাদা করে দাঁড় করায়, সেখানে আমার স্বামী, চাচা, আর বাবা ছিল। সাথে ছিল আরো ২৫ থেকে ২৭ জন ঐ এলাকার পুরুষ। আর মেয়েদের বলা হয় আলাদা লাইনে দাঁড়াতে”। এর পর তার চোখের সামনেই হত্যা করা হয় তার পরিবারের তিনজন পুরুষ সদস্যকে। “এরপর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের মধ্যে যাদের বয়স অল্প তাদের কে ধরে নিয়ে বনের মধ্যে নিয়ে যায়। তাদের উপর চালানো হয় নির্যাতন, ধর্ষণ। “মোহসিনা বলছিলেন “আমাকেকে সাতজন পালাক্রমে ধর্ষণ করে”। তিনি বলছিলেন, “এখন চোখের পানিও শুকিয়ে গেছে, কান্দনও আর আসে না”।জ্ঞান হারান মোহসিনা। চেতনা ফিরে আসার পর পালিয়ে আসেন সেখান থেকে, কোলের শিশু আরকানের খোঁজে। বাড়ি ফিরে শুধু আরকানকে পান। এরপর নাফ নদী পাড়ি দিয়ে যারা বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছেন তাদের দেখা পাওয়ার আসায় নদীর উপকুলে আসেন। তবে তখন তিনি ততক্ষণে অসুস্ত হয়ে পড়েন। হার মোহাম্মদ নামে জাম্বুনিয়ার আরেক ব্যক্তি উদ্ধার করেন মোহসিনাকে। হার মোহাম্মদ বলছিলেন “সেদিন রাতে নৌকায় করে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে অনেকেই টেকনাফের আসার চেষ্টা করছিলেন। সেই দলেই মোহসিনাকে নিয়ে তিনি উঠে পড়েন”। নৌকা পাড়ি দিয়ে টেকনাফের আসার জন্য অবশ্য তাদের গুনতে হয়েছে অর্থ। হার মোহাম্মদ বলছিলেন মায়ানমারে তার ভাষায় দালালদের টাকা দিয়ে তারা নৌকায় উঠে পড়ে। মোহসিনার মত আরো অনেকেই টেকনাফে এসেছেন নদী পাড়ি দিয়ে। তাদের সবার কাছে কম-বেশি একই ধরণের নির্যাতনের কথা শোনা গেল। তবে মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশে কোন সংবাদদাতা বা মানবাধিকার কর্মী প্রবেশ করতে না পারায় এই সব নির্যাতনের কথা কতটা সত্য সেটা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব না।

najib rayaka
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাযাক

এদিকে মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর যে ভাবে দমন-পীড়ন,অত্যাচার-নির্যাতন,ধর্ষন,গণহত্যা চলছে তার কড়া প্রতিবাদ ও নিন্দা করেছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাযাক। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাযাক এক জনসভায় দেয়া বক্তৃতায় মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর তার ভাষায় যে গণহত্যা চলছে তার কড়া নিন্দা করেছেন। রাজধানী কুয়ালালামপুরে রোহিঙ্গাদের প্রতি সমর্থন জানাতে ডাকা ওই সভায় মি. রাযাক বলেন, তিনি বার্মার নেত্রী অং সান সুচি এবং তার সরকারের প্রতি একটি শক্ত বার্তা পৌঁছে দিতে চান। গত অক্টোবর মাস থেকে বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা রোহিঙ্গা মুসলিম ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছে। এতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে। মি. রাযাক আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর পরিকল্পিতভাবে যে হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের যেসব খবর আসছে – সেসব তদন্ত করা হয়। মি. রাযাক তার বক্তৃতায় অং সান সুচি যেভাবে দৃশ্যতই সামরিক অভিযান মেনে নিচ্ছেন – তার সমালোচনা করে তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়ার যথার্থতার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, তাদের অবশ্যই ইসলাম এবং মুসলিমদের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। মায়ানমার অভিযোগ করেছে যে মালয়েশিয়া তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছে। মায়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের অনেকেই রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী বলে মনে করে। মালয়েশিয়ায় এখন প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাস করছে।

মায়ানমার থেকে প্রানভয়ে  পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা বোঝাই ডজন খানেক নৌকা পুশব্যাক করেছে বিজিবি । কক্সবাজারের টেকনাফে নাফ নদের চারটি পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় রোহিঙ্গা মুসলমানদের বহনকারী ডজন খানেক নৌকা

carrying rohingya onlinesangbad
মায়ানমার থেকে প্রান ভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা

ফেরত পাঠিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।গতকাল বুধবার রাত থেকে আজ বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত নৌকাগুলো ফেরত পাঠানো হয়।বিজিবির ভাষ্য, প্রতিটি নৌকায় ১০ থেকে ১২ জন রোহিঙ্গা ছিল।কক্সবাজার বিজিবি-৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইমরান উল্লাহ সরকার জানান, উখিয়ার বিভিন্ন এলাকা দিয়ে অনুপ্রবেশকালে ১৯ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি।এর আগে গতকাল বুধবার নাফ নদের তিনটি পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় রোহিঙ্গা মুসলমানদের বহনকারী পাঁচটি নৌকা মিয়ানমারে ফেরত পাঠায় বিজিবি।মায়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে কয়েক দিন ধরে বহু রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছে। এরই মধ্যে অনেকে বাংলাদেশ অনুপ্রবেশ করেছে। অনেককে ফেরত পাঠানো হয়েছে।মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ‘দাঙ্গা থামাতে’ গিয়ে নিহত হয়েছে প্রায় ৯১ রোহিঙ্গা। গতকাল রোববার রাতে নাফনদীর টেকনাফ প্রান্তের জাদিমুড়া নামক জায়গার বিপরীতে মিয়ানমারের বড়গজিরবিল গ্রাম থেকে একদল রোহিঙ্গা নৌকা নিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ কালে নৌকাটি ডুবে যায়। জনৈকা নারী সাঁতার কেটে বাংলাদেশের পানিসীমায় পৌঁছতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশী জেলেরা মুমূর্ষ অবস্থায় মহিলাটিকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি এনজিও পরিচালিত ক্লিনিকে ভর্তি করে। জেলেরা জানায়, ডুবে যাওয়া নৌকায় ৫০ জনের মত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ছিল। টেকনাফের একজন দালালের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে। নৌকাটি ছোট হলেও অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই হওয়ার কারনে ডুবে যায় ।বড়গজিরবিল গ্রামের জনৈকা রোহিঙ্গা নাম প্রকাশ না করে মোবাইলে সংবাদমাধ্যমকে জানায়, গত শনিবার দুপুরে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন ওই গ্রাম পরিদর্শন করে রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলেন। এইসময় রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ তাদের উপর মায়ানমার সেনাবাহিনীর চলমান সহিংসতা, গণহত্যা, ধর্ষণের কথা মানববন্ধন ও প্লেকার্ড ও ব্যানার প্রদর্শন করে জানায়। কফি আনান ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পর ওই গ্রামের শতাধিক পুরুষ রোহিঙ্গাকে সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে যায় এবং হত্যা করে। গত শনিবার ও রোববার রাতে ওই ২টি গ্রামের ৫০/৬০টি বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। এতে করে গৃহহারা শতাধিক নারী ও শিশু নাফনদীর পাড়ে এসে আশ্রয় নেয়।সূত্রঃবিবিসি, এএফপি,রয়টার্স