নিরলস অকৃত্রিম ইসলামি সাহিত্যিক সৈয়দ এমদাদ

343

প্রফেসর আলহাজ্ব মুহাম্মাদ মাসউদুর রহমানঃ

গবেষক: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ইসলামের অবদান অবিভক্ত বাংলার মুসলমান সরকারি পুলিশ কর্মচারীদের মধ্যে সাহিত্যিক সৈয়দ এমদাদ আলীর (১৮৭৬-১৯৫৬) নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি একজন পদস্থ পুলিশ কর্মচারী হয়ে সরকারি দায়িত্ব পালন করেও সাহিত্য সাধনায় ছিলেন নিরলস। তার রচিত সাহিত্যে মুসলমান সমাজের প্রতি তার অকৃত্রিম দরদের পরিচয় পাওয়া যায়। তার শ্রেষ্ঠ সাহিত্য র্কীতি ‘নবনূর’ পত্রিকা সম্পাদনা। এ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি বাঙালি মুসলমান সমাজকে ইসলামি ভাবধারায় নানাভাবে জাগ্রত করার প্রয়াস পেয়েছেন। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে তার সম্পাদনায় কলকাতা থেকে মাসিক ‘নবনূর’ পত্রিকা বের হয়। ‘নবনূর’ বাঙালি মুসলিম জাগরণ যুগের সর্বপ্রথম প্রগতিশীল মাসিক পত্রিকা। সংগঠক হিসেবেও সৈয়দ এমদাদ আলী কৃতিত্বের পরিচয় দেন। ‘নবনূর’র সম্পাদক সম্বন্ধে ‘বার্ষিক সওগাত’ (১৩৩৩) যা লিখে ছিলো তা পাঠকের অবগতির জন্য উল্লেখিত হলো “তিনি যখন ময়মনসিংহ এর নেত্রকোনা দত্ত স্কুলের অন্যতম শিক্ষক ছিলেন তখন ‘নবনূর’ পত্রিকার সম্পাদনার-ভার গ্রহণ করেন। ‘নবনূর’ সম্পাদক সৈয়দ এমদাদ আলী যে যোগ্যতা, শক্তিমত্তা, দূরদর্শিতা ও সাহিত্য প্রতিভার পরিচয় প্রদান করিয়াছেন কোন প্রবীণ সাহিত্যিক ও সাহিত্যানুসারী ব্যক্তিই আজ পর্যন্ত তা বিস্মৃত হতে পারেন নাই। আজ যাঁরা সাহিত্য ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত তাঁদের কেহ কেহ তখন ‘নবনূরে’ লিখে হাত পাকা করতেছিলেন। সম্পাদক রূপে নতুন লেখক তৈরি করতে সৈয়দ সাহেব বেশ দক্ষ ছিলেন। জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। পুলিশ বিভাগে চাকরি করেও সৎ ও পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন করতেন। কর্মদক্ষতার গুণে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে লাভ করেন খান সাহেব উপাধি। ইসলামি সাহিত্যিক এমদাদ আলী শুধু কবিই ছিলেন না একাধারে তিনি ঔপন্যাসিক ও চিন্তাশালী প্রবন্ধকারও ছিলেন। বহু প্রবন্ধের মধ্যবর্তিতায় তিনি আমাদের দিক্পালের ভূমিকা পালন করেছেন। ‘ডালি’ সৈয়দ এমদাদ আলীর শ্রেষ্ঠ কাব্যকীর্তি। হাজরত রাবিয়া বাসরীর জীবন অবলম্বনে তার গদ্যগ্রন্থ ‘তাপসী রাবিয়া’ও একখানা বিশিষ্ট গ্রন্থ। এখানে এমদাদ আলী তপস্বিনী বাবিয়ার শুধু বাহির্জীবনের ঘটনা বর্ণনা করেননি, তার জন্ম-মৃত্যু ও বহির্জীবনের ইতিহাস যৎসামান্য উল্লেখ করে অধিকাংশ স্থানজুড়েই তিনি তার সাধন-কাহিনী বর্ণনা করেছেন।আল্লাহ্ প্রেমে আশগুল হলে মানুষ কিভাবে তার ‘তনুমনধন জীবন যৌবন’ আল্লাহর রাহে লুটিয়ে দিতে পারে তাপসী রাবিয়ার অন্তর্জীবনের ধারাবাহিক উন্নতি বিচার প্রসঙ্গে এমদাদ আলী তার সুষ্ঠু নির্দেশ দিয়েছেন। এ বইটিকে মোটামুটি দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম ৬৪ পৃষ্ঠায় তাপসী রাবিয়ার জীবন ও স্বপ্ন সাধনার কথা এবং পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে সূফী মতবাদ এবং সূফী সাধনার তত্ত্ব বিশ্লেষিত হয়েছে। বর্ণনাভঙ্গি অত্যন্ত সাবলীল; চিন্তার স্বচ্ছতা থাকার কারণে দ্বিতীয় অংশে সূফী তত্ত্বের দুরূহ বিষয়বস্তুও বর্ণনায় সহজগতি পেয়েছে। মুসলিম সমাজকে পটভূমি হিসেবে অবলম্বন করে তিনি ‘হাফিজা’ (১৯২৮ খ্রি.) নামে একটি পত্রোপন্যাস রচনা করেন।তবে ‘ডালি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। এ কাব্যের‘আলমগীর’ নামক কবিতায় তিনি লিখেছেন তুমি শুধু মহান, তুমি ত্যাগী, তুমি বীর।… দেখেছিলে তুমি দিব্যদৃষ্টি দিয়া হায় এ ভারত ভূমি মুসলিম-কীর্তির হবে মহা গোরস্থান দিল্লী-আগ্রা একদিন হবে হতমান। দেখেছিলে তুমি, এক নবরাজ্য গড়ি’ শিবাজী দাঁড়ায়ে হোথা মোগলের অরি। দেখেছিলে বিজাপুরী তুলি ঊর্ধ্ব ফণা মারাঠার সাথে মিলি’ করিয়ে জল্পনা দংশিতে মোগল-শক্তি। … সত্য ভেবেছিলে, মোগলের শক্তি নাহি সুদৃঢ় করিলে ভারতে, জগতে হবে মুসলিম পতন।’ কিন্তু অতীতের দুঃখভাবনিয়ে বসে থাকলে তো মানুষ বিষাদ আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে পঙ্গু হয়ে যাবে তার চিন্তা-চেতনা। তাই কর্মমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে জীবনের প্রকৃত অর্থকে অর্থময় করে তুলতে হবে‘এ জীবন নহে শুধু বিষাদ লাগিয়া, এ জীবনে কত কাজ আছে, বিষাদ তো কর্মপথরহে আগুলিয়া তাই তারে ফেলা চাই পাছে।… কি আপন কিবা পর এক হয়ে যাবে সমভাবে উঠিবে জাগিয়া।সৈয়দ এমদাদ আলী শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক যে কেবল উচ্চ মানের সাহিত্য পত্রিকা প্রতিষ্ঠা লাভ করে তা নয়। নানা সামাজিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিষয়ে এই পত্রিকায় নিয়মিত রচনা প্রকাশ হতো। ‘হিন্দু-মুসলমানের বিরোধের উপায় ইসলামি দৃষ্ঠি’ সম্পর্কে প্রবন্ধ রচনার জন্য পত্রিকা-কর্তৃপক্ষ দুটি পুরস্কার ঘোষণা করেছিল : একটি হিন্দু লেখকের জন্য অপরটি মুসলমান লেখকেরজন্য। ‘নবনূর’ যাদের রচনায় সমৃদ্ধ হতো তাদের মধ্যে ছিলেন আবদুল্লাহ্ আল মামুন, সোহ্রাওয়ার্দী, কায়কোবাদ, মোজাম্মেল হক, শেখ ফজলল করিম, ওসমান আলী,এমদাদুল হক, আবদুল করিম (সাহিত্য বিশারদ, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন,যদুনাথ সরকার, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র-মজুমদার, রামপ্রাণ গুপ্ত, চারুচন্দ্র মিত্র, কেশবচন্দ্র গুপ্ত, জীবেন্দ্র কুমার দত্ত, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, নিশিকান্ত চক্রবর্তী, সরলাদেবী ও অনুপমা দেবী। মুসলমান সম্পাদিত অন্যান্য পত্রিকার মতো এতেও ইসলামের ইতিহাস, ঐতিহ্যও ধর্মনীতির আলোচনা থাকতো। এ বিষয়ে হিন্দু-মুসলমান উভয়েই লিখতেন।চারুচন্দ্র মিত্রের ‘ধর্মযুদ্ধ’ ও ‘কুরআন-শারীফের ইতিবৃত্ত’, রামপ্রাণ-গুপ্তের ‘খলিফাগণের শাসননীতি’, ‘সুলতান সালাউদ্দিন’ ও ‘মোগল রাজবংশ’, কেশবচন্দ্র গুপ্তের ‘মুসলমানাধিকৃত ভারতবর্ষের ইতিহাস’ ও ‘আওরঙ্গজেবের পুত্র কন্যাগণ’ প্রভৃতি। হিন্দু লেখকগণের অনূদিত রচনাও ‘নবনূরে’ প্রকাশিত হয়। নির্মলচন্দ্র ঘোষের ‘মুসদ্দস-ই-হালী’র অনুবাদ এবং সতীশচন্দ্র রায়ের কালিদাসের ‘ঋতুসংহারের’ অনুবাদ বের হয় নবনূর পত্রিকায়। ধর্মযুদ্ধ সম্পর্কে লিখেছিলেন সৈয়দ এমদাদ আলী। তসলিম উদ্দীন আহমদের কুরআন অনুবাদের অংশ বিশেষ এতে প্রকাশিত হয়েছিল।‘খলিফাগণের শাসন-নীতি’ সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে সুবৃহৎ আলোচনার অবতারণা করেন ফজলর রহমান খাঁ। আওরঙ্গজেব সম্পর্কে অনেকগুলো প্রবন্ধের মধ্যে এসএমএ আহাদের আলোচনা উল্লেখ্যযোগ্য। আবদুল্লাহ্ সোহ্রাওয়ার্দীর ‘আরবীয় দর্শন আলোচনা’এবং মোহাম্মদ কে চাঁদের ‘হাই ইবনি ইয়কাজান’ এই ধারায় মূল্যবান সংযোজন। সম্পাদক সৈয়দ এমদাদ আলীর এই ভারসাম্য ও সাম্প্রদায়িক সহযোগিতা সত্ত্বেও হিন্দু লেখকের অঙ্কিত মুসলিম চরিত্র ‘নবনূরের’ লেখকদের বিচলিত না করে পারেনি।মনোমোহন গোস্বামী রচিত ‘শিবজী বা সাজাদী রোশিনারা’ নামের নাটকের বিরূপ সমালোচনা হয়। ‘কেনচিৎ মর্মাহতের হিতকামী না’ ছদ্মনামে জনৈক লেখক ক্ষুব্ধচিত্তে প্রশ্ন করেন সাহিত্যরথী সুধীপ্রবর বঙ্কিমবাবু হটতে আরম্ভ করে অতিনগণ্য পঁটিরামপর্য্যন্ত মুসলমান সমাজের অযথা নিন্দাবাদ করে জগতের চক্ষে তৎসমাজকে চিরকলঙ্কিত করে রাখবার প্রয়াসী হয়েছেন এবং হতেছেন ইহা কি ভাল কথা? আফতাব উদ্দীন আহোদ, মোহাম্মদ ইসহাক, ইমদাদুল হক, ডাক্তার মোহাম্মদ হাবিবর রহমান এবং সম্পাদক স্বয়ং এ বিষয়ে আপত্তি প্রকাশ করলেও ভিন্নসুর শোনা গেল মোহাম্মদ হেদায়েতুল্লাহর রচনায়। তিনি লক্ষ্য করলেন হিন্দু লেখকরা এখন মুসলমানের গুণকীর্তনে ‘পরান্মুখ নহেন’ এবং প্রমাণস্বরূপ দেখালেন রবীন্দ্রনাথের ‘সতী’ নাটিকা ও ক্ষীরোদ প্রসাদের ‘রঘুবীর’ নাটক। বঙ্গভঙ্গের প্রাক্কালে হিন্দু-মুসলমানের মিলিত রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে আরো কয়েকটি প্রবন্ধ ‘নবনূরে’প্রকাশিত হয়। খয়রুন্নিসা মুসলমান নারী সমাজকে বিলাতী পণ্য বর্জন করার আহ্বান জানান। এদিকে উদ্দীন আহমাদ ‘সৃষ্টিছাড়া’ বঙ্গভঙ্গ-প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সকল মুসলমানের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করেন। আবার ‘খয়ির খান্ মুনশী’ মুসলমানদেরকে রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগদানের প্রেরণা দেন। তিনি লিখেন- ‘ফলত: কি হিন্দু কি মুসলমান সকলের পক্ষেই রাজনৈতিক আন্দোলন সমান প্রয়োজনীয়। … আজকাল হিন্দু-মুসলমান পরস্পরের হাত ধরিয়া গভর্নমেন্টের কৃপাভিখারী হয়ে রাজনৈতিকআন্দোলনে বিরত ছিলেন। তাতে কি ফল লাভ হয়েছে?’ ‘নবনূরের একজন প্রধান লেখিকা ছিলেন বেগম রোকেয়া। সম্পাদকও নারী-স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু এ বিষয়েও মতবিরোধ ছিল। একজন লেখক সুস্পষ্টই বললেন, ‘নারী কখনও সমস্ত বিষয়ে পুরুষের সমতুল্য হতে পারে না তা হলে স্বভাবের বিরুদ্ধাচরণ করা হবে।’নওশের আলী খান ইউসফজীর মতো উদার লেখকও বেগম রোকেয়াকে ঠাট্টা করে প্রবন্ধ লিখেছেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথমে বাঙালি মুসলমান জীবনের সর্বস্তরে যে একটা বড় রকমের দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়েছিলেন ‘নবনূর’ পত্রিকায় তার প্রতিফলন লক্ষ্যকরা যায়। এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে চলার পথ করে তাদের এগিয়ে আসতে হয়। এদের যাত্রাপথের দিশারী হিসেবে সৈয়দ এমদাদ আলী স্মরণীয় ভূমিকা রাখেন। বিক্রমপুর-মুন্সীগঞ্জের এক নি¤œবিত্ত অথচ সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৮৭৬ খ্রি., ১ আশ্বিন দামপাড়া গ্রামে এই মনীষী ব্যক্তিত্ব জন্মগ্রহণ করেন। আশি বছর বয়সে ১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন দামপাড়ার নিজ বাসভবনে।

লেখক: কথা সাহিত্যিক, টিভি ভাষ্যকর, তাকওয়া পাবলিকেশন্স এর প্রকাশক, আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টিবোর্ডের ট্রেজারার ও গবেষক: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ইসলামের অবদান