ডোকালাম থেকে সেনা প্রত্যাহার না করলে দিল্লিকে এর পরিণতি ভোগ করতে হবে:চীন

231
chinese intrusions.
ভারত-সিকিম-ভুটান-চীন সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত অঞ্চলের ডোকালাম।

ঢাকা শনিবার,৫ আগস্ট ২০১৭: চীন আবারও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, সিকিম-তিব্বত-ভুটান সীমান্ত থেকে অর্থাৎ ডোকালাম থেকে ভারত তাদের সেনাবাহিনীকে সরিয়ে না নেয়, তাহলে দিল্লিকে তারজন্য চরম শাস্তি ভোগ করতে হবে। দিল্লিতে চীনের জনৈক কূটনীতিক লিয়ু জিনসঙ বলেছেন,ভারতীয় সেনারা ডোকলাম এলাকায় অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয়ে চীনের সীমানায় প্রবেশ করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ডোকলাম বিবাদ নিয়ে ১৫ পাতার বিস্তারিত নোট জারী করার একদিন পরই অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই মন্তব্য করল চীন।চীনের ওই নোটে বলা হয়েছে,”১৬ই জুন চীন ডোঙ লাঙ্গ (ডোকলাম) এলাকায় রাস্তা তৈরির কাজ করছিল। গত ১৮ই জুন ২৭০ জনেরও বেশী ভারতীয় সেনা অস্ত্র আর দুটি বুলডোজার নিয়ে সিকিম সেক্টর থেকে ডোকালাম গিরিপথের কাছে সীমান্ত অঞ্চলে চলে আসে এবং চীনের রাস্তা তৈরির কাজে বাধা দেয়। “রাস্তা তৈরির কাজে বাধা দিতেই ওই ভারতীয় সেনারা চীনের এলাকার ১০০ মিটার ভেতরে ঢুকে পড়ে। একপর্যায়ে সেখানে প্রায় ৪০০ ভারতীয় সৈনিক হাজির হয়।”ওই নোটে দাবী করা হয়, “ভারতের সেনাবাহিনী সেখানে তিনটি তাঁবু খাটায় এবং চীনের সীমানার ১৮০ মিটার ভেতরে ঢুকে আসে। জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত সেখানে ৪০ জন ভারতীয় সেনা সদস্য আর একটি বুলডোজার চীনা সীমান্তের ভেতরে অবৈধভাবে অবস্থান করছে।”ভারতের বক্তব্য হলো অমীমাংসিত এলাকায় চীনকে রাস্তা তৈরি করতে দেয়া হবে না। আর এ কারনেই সেখানে ভারত সেনা পাঠিয়েছে। চীনের সরকারী সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার খবর অনুযায়ী চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ভারতকে তাদের সেনা সরিয়ে নিতে বলেছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রেন গোকিয়াং বলছেন, সীমান্ত এলাকায় শান্তি বজায় রাখার জন্য ভারতের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। তা না হলে এর ফল মোটেও ভাল হবে না।

উল্লেখ্য ডোকালাম হল ভারত-তিব্বত-সিকিম-ভুটান-চীন সীমান্ত এলাকার অবস্থিত একটি অঞ্চলের নাম।ভারত-চীন সীমান্তের ডোকালাম ইস্যু নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ ভারত ও চীনের মধ্যে টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে। চীন বলছে, ডোকালাম সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সেনারা চীনের সীমান্ত এলাকার মধ্যে জোর করে প্রবেশ করেছে।শুধু তাই নয়, ভারতে যে হিন্দু জাতীয়বাদের উত্থান চলছে,তার জন্যই ডোকালাম ইস্যু ভারত-চীন এই দুই দেশের মধ্যে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ডোকালাম সীমান্ত সমস্যা নিয়ে চীন দাবি করেছে যে, নরেন্দ্র মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরই বিষয়টি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে যেন আগুনে ঘি ঢালার মত।চীনা সংবাদমাধ্যমগুলির বলছে,বিজেপি হিন্দুত্ববাদের ওপর ভর করেই কেন্দ্রের ক্ষমতা দখল করেছে নরেন্দ্র মোদী।আর তার জেরেই ডোকালাম সীমান্ক ইস্যু নিয়ে এবার সুর চড়াতে শুরু করেছে ভারত। ডোকালাম নিয়ে যে পথ নিয়েছে ভারত, তাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ক্ষমতা এবং প্রতিপত্তি দেশে বৃদ্ধি পেলেও,ভারত নাকি ক্রমশ রক্ষণশীলদের কবজায়ওলে যাচ্ছে পুরা ভারত। চীন এবং পাকিস্তানের সঙ্গে কঠোর মনোভাব দেখানোর জন্য হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো নরেন্দ্র মোদীর ওপর প্রচন্ড চাপ প্রয়োগ করছে্আর এ কারনেই বর্তমান ডোকালাম সীমান্ত নিয়ে নয়া দিল্লির সঙ্গে বেইজিংয়ের উত্তাপ বাড়ছে।

china army.
ভারত-তিব্বত-সিকিম-ভুটান-চীন সীমান্ত এলাকায় চীনা সেনাবাহিনীর অবস্থান।

ভারত-চীন সীমান্ত ডোকালাম বিরোধকে কেন্দ্র করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ সম্প্রতি সংসদে এক বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন,চীনের যুদ্ধের হুমকিতে ভারত মোটেও ভীত নয়। চীন আক্রমণ করলে নিজেদের রক্ষা করার মতো যথেষ্ট সক্ষমতা ভারতের রয়েছে। তিনি সেখানে বলেন,‘ভারতকে যদি ডোকালাম সীমান্ত অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হয়, তা হলে চীনকেও একই পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে। উল্লেখ্য গত ১৬ জুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দু’দেশের মধ্যেকার উত্তেজনা চরম পর্যায় পৌঁছায। চীনের সেই পদক্ষেপ মেনে নেয়া ভারতের পক্ষে মোটেও সম্ভব ছিল না বলে তিনি সংসদকে জানান। তিনি আরো বলেন,‘বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত-চীন সীমান্ত উত্তেজনা নিয়ে আমরা কথা বলেছি। দেশবাসীর চিন্তা করার কোনো কারণই নেই,কারণ প্রায় সব দেশ ওই ইস্যুতে ভারতের পাশে আছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বিবৃতির পরপরই চীনা সরকারি মুখপত্র ভারতকে ওই ইস্যুতে তীব্র সমালোচনার করেছে এবং তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।চীনা সরকারি গণমাধ্যম‘গ্লোবাল টাইমস’ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের মন্তব্যকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হয়েছে। চীনা সংবাদপত্রটিতে ভারতে সামরিক অভিযানের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে,চীন আগে থেকেই অনেক সংযম এবং সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু ভারত যদি ডোকালাম সীমান্ত থেকে সেনা অপসারণ না করে তাহলে চীন,ভারতের সঙ্গে লড়াই করবে এর কোনো বিকল্প পথ থাকবে না।কূটনৈতিকভাবে যদি সমস্যার সমাধান না হয় তাহলে চীনকে বাধ্য হয়ে সামরিক পদক্ষেপ নিতে হবে।ডোকালাম থেকে চীনা সেনা অপসারণ ভারতের জন্য স্বপ্নই থেকে যাবে। চীনা সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমস বলছে ‘ভারত, চীন সীমান্তের বেশকিছু এলাকা দখল করে রেখেছে। ভারতের ওই পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক মহলে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।ভারত,চীনের সামরিক শক্তির দিক থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।তাই এই অচলাবস্থা চলতে থাকলে যে কোন সময় যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে।আর ভারত যদি অনমনীয় মনোভাব বজায় রাখে তাহলে ভারতকে গুরুতর ফল ভোগ করতে হবে।বুঝতে হবে চীনা আর্মি ভারতের সেনাবাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।সুতরাং ভারতের উচিৎ ডোকালাম এলাকা নিয়ে নিজেদের দীর্ঘদিনের কল্পনার অবসান ঘটানো।চীন কোনো অবস্থাতেই নিজেদের এক ইঞ্চি জমিও ছাড় দেবে না।চীন সরকার তাদের জনগণের অনুভূতিকে কখনো আহত করতে চায় না

চীনা সরকারি গণমাধ্যম‘গ্লোবাল টাইমস ইতোপূর্বে মন্তব্য করে বলেছিল,ভারত যদি সিকিমে সেনা পাঠিয়ে ডোকালাম সীমান্ত বিতর্কে নাক গলাতে পারে তবে চীনা আর্মিও কাশ্মীরে ঢুকে পড়তে পারে। এমন কথা বলেছেন একজন চীনা সমর বিশেষজ্ঞ লং জিংচুন। চীনের বক্তব্য, ডোকালাম সমিান্ত তাদের এলাকা। চায়না ওয়েস্ট নর্মাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইন্ডিয়ান স্টাডিজের ডিরেক্টর লং জিংচুন সম্প্রতি ভারত-চীন অশান্তির দায় পুরোপুরি চাপিয়েছেন দিল্লির ঘাড়ে। তাঁর বক্তব্য, ভারত যদি ভুটানের অনুরোধে ভুটান-সিকিম এলাকায় ঢুকে পড়তে পারে, তাহলে পাকিস্তানের অনুরোধে বেইজিংও কাশ্মীরে ঢুকে যেতে পারে। যদিও চীন কাশ্মীর সমস্যায় নাক গলাচ্ছে না।তবে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের রাস্তাঘাট,পরিকাঠামোও তৈরি করছে। চীন-পাকিস্তান যে ইকোনমিক করিডোর তারা তৈরি করছে, তাও যাচ্ছে অধিকৃত কাশ্মীরের ওপর দিয়ে।ভারত,দক্ষিণ এশিয়ার ছোট ছোট দেশগুলোর উপর ‘দাদাগিরি’ করে আসছে দীর্ঘ দিন ধরে। অন্যের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলাচ্ছে। পশ্চিমী দেশ ও তাদের সংবাদমাধ্যম দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ‘দাদাগিরি’ নিয়ে যে মুখ খুলছে না। ভারত দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সমতা ও অন্যের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক না গলানোর পক্ষে সওয়াল করেছে। ভারত নিজে দক্ষিণ এশিয়ায় আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করছে যা জাতিসংঘ সনদের বিরোধী।নেপাল ও ভুটানে বহু ভারতীয় বসবাস করেন, ভারত ওইসব দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলান। তাই তাঁর উপদেশ,নেপাল ও ভুটানের প্রথম চ্যালেঞ্জ হল, যাতে তারা সিকিমের মত ভারতের অঙ্গরাজ্য না হয়ে ওঠে সে বিষয়টা নিশ্চিত করা ও নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।