জনপ্রিয় কণ্ঠ শিল্পী আব্দুল জব্বার আর নেই

83
Abdul-Jabbar
জনপ্রিয় কণ্ঠ শিল্পী আব্দুল জব্বার আর নেই।(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
ঢাকা,বুধবার ৩০ আগস্ট ২০১৭:জনপ্রিয় কণ্ঠ শিল্পী আব্দুল জব্বার আর নেই।তিনি আমাদের ছেড়ে আজ চির বিদায় নিলেন।বাংলাদেশের অত্যন্ত সুপরিচিত ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠ শিল্পী আব্দুল জব্বার আজ বুধবার সকাল ৯টা ২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। কণ্ঠ শিল্পী আব্দুল জব্বার দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে ভুগছিলেন। গত বেশ কিছুদিন যাবৎ তিনি ঢাকার বঙ্গবন্ধু মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।হাসপাতালে শিল্পীর পুত্র মিথুন জব্বার বাসসকে জানান, অসুস্থ হয়ে পড়লে শিল্পীকে প্রায় এক মাস আগে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি হতে থাকলে গত রোববার থেকে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।সরকারের পক্ষ থেকে হাসপাতালে শিল্পী আবদুল জব্বারের সকল প্রকার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।শিল্পী আব্দুল জব্বার তার প্রথম স্ত্রী হালিমা জব্বারের ঘরে ২ ছেলে মিথুন জব্বার ও বাবু জব্বার এবং এক মেয়ে টুনটুন জব্বার, আর দ্বিতীয় স্ত্রী শাহীন জব্বারের ঘরে একমাত্র মেয়ে মুনমুন জব্বারকে রেখে গেছেন।
Abdul Jabbar
জনপ্রিয় কণ্ঠ শিল্পী আব্দুল জব্বার।
শিল্পী আব্দুল জব্বার ১৯৩৮ সালের ৭ নভেম্বর কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহন করেন। ১৯৫৮ সাল থেকে তিনি বেতারে নিয়মিত শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।তিনি ১৯৬২ সালে প্রথম চলচ্চিত্রের জন্য গান করেন। ১৯৬৪ সাল থেকে তিনি বিটিভির নিয়মিত গায়ক হিসেবে পরিচিতি পান। ১৯৬৪ সালে জহির রায়হান পরিচালিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র সংগমের গানে কণ্ঠ দেন।সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮০ সালে একুশে পদক ও ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার পান।তিনি স্বাধীনতা পদক, একুশে পদকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পদক অর্জন করেন। ২০১৭ সালে মুক্তি পায় দেশবরেণ্য এই সঙ্গীত শিল্পীর প্রথম মৌলিক গানের অ্যালবাম কোথায় আমার নীল দরিয়া। অ্যালবামটির গীতিকার মোঃ আমিরুল ইসলাম, সুরকার গোলাম সারোয়ার।
উল্লেখ্য, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আব্দুল জব্বার হারমোনিয়াম গলায় ঝুলিয়ে কলকাতার বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্পে যেয়ে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্ধুদ্ধ করেছেন। সেই দুঃসময়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গেয়েছেন অসংখ্য গান। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এই শিল্পীর গাওয়া বিভিন্ন গান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা ও মনোবল বাড়িয়েছে। ১৯৭১ সালে তিনি মুম্বাইয়ে ভারতের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জনমত তৈরিতে নিরলসভাবে কাজ করে যান।তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে প্রচারিত “সালাম সালাম হাজার সালাম”, “জয় বাংলা বাংলার জয়” সহ এরকম বহু উদ্বুদ্ধকরণ গানের গায়ক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।’’তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়, ‘ওরে নীল দরিয়া,পিচ ঢালা এই পথটাকে ভালোবেসেছি’,সহ অসংখ্য কালজয়ী গান গেয়েছেন এই শিল্পী। ১৯৬৮ সালে এতটুকু আশা ছবিতে সত্য সাহার সুরে তাঁর গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু’ গানটি জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৬৮ সালে পীচ ঢালা পথ ছবিতে রবীন ঘোষের সুরে ‘পীচ ঢালা এই পথটারে ভালবেসেছি’ এবং ঢেউয়ের পর ঢেউ ছবিতে রাজা হোসেন খানের সুরে ‘সুচরিতা যেওনাকো আর কিছুক্ষণ থাকো’ গানে কণ্ঠ দেন। ১৯৭৮ সালে সারেং বৌ চলচ্চিত্রে আলম খানের সুরে ‘ও..রে নীল দরিয়া’ গানটি দর্শকপ্রিয়তা।
বাংলা গানের এই কিংবদন্তি শিল্পীর মৃত্যুর সংবাদ দ্রুত রাজধানীসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। শিল্পীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক আইন মন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু, শিল্পী তিমির নন্দী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছসহ সংস্কৃতি অঙ্গণের অনেকেই হাসপাতালে ছুটে যান।
হাসপাতাল থেকে শিল্পীর মরদেহ প্রায় ১২টার দিকে মোহাম্মদপুরের মারকাজুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শিল্পীর গোসলের কাজ শেষে তার মরদেহ কলাবাগানের ভুতের গলি ৫৭/সি, নর্থ সাউথি রোডের ফ্ল্যাট বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মহল্লাবাসীর শোক প্রকাশের পর তার মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিম ঘরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়।সর্বস্তরের মানুষের শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য শিল্পীর মরদেহ আগামীকাল সকাল ১১ টা থেকে ১টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ জোহর নামাজে জানাজা শেষে শিল্পীকে দাফন করা হবে।
এ শিল্পীর প্রয়াণে সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, বাঙালির সংস্কৃতি ও সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়া মানুষদেরই একজন ছিলেন শিল্পী আব্দুল জব্বার। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধে তিনি কণ্ঠসৈনিক হিসেবে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন। মুক্তিযোদ্ধা এ শিল্পীর সঙ্গীত সংরক্ষণে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলেও মন্ত্রী জানান।
শিল্পী আবদুল জব্বারের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা এই শির্পীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। তার মৃত্যুতে আরো শোক প্রকাশ করেছেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।