চীন-ভারত সীমান্ত উত্তেজনা অব্যাহত

চীন-ভারত সীমান্ত উত্তেজনা অব্যাহত

690
chinese-intrusions.
ভারত-সিকিম-ভুটান-চীন সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত অঞ্চলের ডোকালাম।

ঢাকা ২২ জুলাই ২০১৭:ডোকালাম হল ভারত-সিকিম-ভুটান-চীন সীমান্ত এলাকার অবস্থিত একটি অঞ্চলের নাম।ভারত-চীন সীমান্তের ডোকালাম ইস্যু নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ ভারত ও চীনের মধ্যে টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে। চীন বলছে, ডোকালাম সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সেনারা চীনের সীমান্ত এলাকার মধ্যে জোর করে প্রবেশ করেছে।শুধু তাই নয়, ভারতে যে হিন্দু জাতীয়বাদের উত্থান চলছে,তার জন্যই ডোকালাম ইস্যু ভারত-চীন এই দুই দেশের মধ্যে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ডোকালাম সীমান্ত সমস্যা নিয়ে চীন দাবি করেছে যে, নরেন্দ্র মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরই বিষয়টি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে যেন আগুনে ঘি ঢালার মত।চীনা সংবাদমাধ্যমগুলির বলছে,বিজেপি হিন্দুত্ববাদের ওপর ভর করেই কেন্দ্রের ক্ষমতা দখল করেছে নরেন্দ্র মোদী।আর তার জেরেই ডোকালাম সীমান্ক ইস্যু নিয়ে এবার সুর চড়াতে শুরু করেছে ভারত। ডোকালাম নিয়ে যে পথ নিয়েছে ভারত, তাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ক্ষমতা এবং প্রতিপত্তি দেশে বৃদ্ধি পেলেও,ভারত নাকি ক্রমশ রক্ষণশীলদের কবজায়ওলে যাচ্ছে পুরা ভারত। চীন এবং পাকিস্তানের সঙ্গে কঠোর মনোভাব দেখানোর জন্য হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো নরেন্দ্র মোদীর ওপর প্রচন্ড চাপ প্রয়োগ করছে্আর এ কারনেই বর্তমান ডোকালাম সীমান্ত নিয়ে নয়া দিল্লির সঙ্গে বেইজিংয়ের উত্তাপ বাড়ছে।

'Global Times
চীনা সরকারি গণমাধ্যম‘গ্লোবাল টাইমস

চীনা সরকারি গণমাধ্যম‘গ্লোবাল টাইমস’ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের মন্তব্যকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হয়েছে। চীনা সংবাদপত্রটিতে ভারতে সামরিক অভিযানের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে,চীন আগে থেকেই অনেক সংযম এবং সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু ভারত যদি ডোকালাম সীমান্ত থেকে সেনা অপসারণ না করে তাহলে চীন,ভারতের সঙ্গে লড়াই করবে এর কোনো বিকল্প পথ থাকবে না।কূটনৈতিকভাবে যদি সমস্যার সমাধান না হয় তাহলে চীনকে বাধ্য হয়ে সামরিক পদক্ষেপ নিতে হবে।ডোকালাম থেকে চীনা সেনা অপসারণ ভারতের জন্য স্বপ্নই থেকে যাবে। চীনা সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমস বলছে ‘ভারত, চীন সীমান্তের বেশকিছু এলাকা দখল করে রেখেছে। ভারতের ওই পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক মহলে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।ভারত,চীনের সামরিক শক্তির দিক থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।তাই এই অচলাবস্থা চলতে থাকলে যে কোন সময় যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে।আর ভারত যদি অনমনীয় মনোভাব বজায় রাখে তাহলে ভারতকে গুরুতর ফল ভোগ করতে হবে।বুঝতে হবে চীনা আর্মি ভারতের সেনাবাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।সুতরাং ভারতের উচিৎ ডোকালাম এলাকা নিয়ে নিজেদের দীর্ঘদিনের কল্পনার অবসান ঘটানো।চীন কোনো অবস্থাতেই নিজেদের এক ইঞ্চি জমিও ছাড় দেবে না।চীন সরকার তাদের জনগণের অনুভূতিকে কখনো আহত করতে চায় না।

Sushma Swaraj
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ

ভারত-চীন সীমান্ত ডোকালাম বিরোধকে কেন্দ্র করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গত বৃহস্পতিবার সংসদে এক বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে বলেছেন,চীনের যুদ্ধের হুমকিতে ভারত মোটেও ভীত নয়। চীন আক্রমণ করলে নিজেদের রক্ষা করার মতো যথেষ্ট সক্ষমতা ভারতের রয়েছে। তিনি বলেন,‘ভারতকে যদি ডোকালাম সীমান্ত অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হয়, তা হলে চীনকেও একই পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।গত ১৬ জুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দু’দেশের মধ্যেকার উত্তেজনা চরম পর্যায় পৌঁছায।চীনের সেই পদক্ষেপ মেনে নেয়া ভারতের পক্ষে মোটেও সম্ভব ছিল না বলে তিনি জানান। তিনি আরো বলেন,‘বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত-চীন সীমান্ত উত্তেজনা নিয়ে আমরা কথা বলেছি। দেশবাসীর চিন্তা করার কোনো কারণই নেই,কারণ প্রায় সব দেশ ওই ইস্যুতে ভারতের পাশে আছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বিবৃতির পরপরই চীনা সরকারি মুখপত্র ভারতকে ওই ইস্যুতে তীব্র সমালোচনার করেছে এবং তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

China'army
ডোকালাম সীমান্ত এলাকায় টহলরত চীনের সেনাবাহিনীর একাংশ।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বিবৃতিতে ক্ষিপ্ত হয়ে চীন পুনরায় যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।এর আগেও একই ইস্যুতে চীনের সরকারি গণমাধ্যমে একনাগাড়ে যুদ্ধের হুমকি দিয়ে ভারত ডোকালাম থেকে অবিলম্বে সেনা প্রত্যাহার না করলে ‘গুরুতর ফল’ ভোগ করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল।সম্প্রতি চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশনের তরফে একটি ফুটেজ প্রকাশ করা হয়েছে l সেখানে দেখানো হয়েছে, কীভাবে সিকিমে ভারতীয় সেনাদের বাঙ্কারে হামলা চালাচ্ছে চীনা সেনারা l মর্টার, রকেট লঞ্চার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ভারতীয় সেনার বাঙ্কার l কিন্তু,বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র গোপাল বাগলে বলেন, চীনের ওই দাবি পুরোপুরি ভিত্তিহীন।
এদিকে ভারতের সংসদে চাঞ্চল্যকর এক প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে। পেশ করা ঐ প্রতিবেদনে কম্পট্রোলার এবং অডিটর জেনারেল বা সিএসি জানিয়েছে ভারতের সেনাবাহিনীর কাছে মাত্র ১০ দিন যুদ্ধ চালানোর মতো গোলাবারুদ মজুদ রয়েছে। প্রতিবেদনে ভারতের অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি বোর্ড বা ওএফবি’র কর্মদক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে,২০১৩ সালের পর এ সংস্থার আওতাধীন কারখানাগুলোর তৎপরতায় কোনো উন্নয়ন ঘটেনি। ঐ প্রতিবেদনটি ২০১৬ সালে সেপ্টেম্বরে তৈরি করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে এ জাতীয় গোলা সরবরাহের যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে ওএফবি। এতে আরো বলা হয়েছে, সর্বনিম্ন মাত্রায় মজুদ রাখার মাপকাঠি ৫৫ শতাংশ যা মজুদ রাখা গোলাবারুদের ক্ষেত্রে মানা হয়নি। এ ছাড়া,আর ৪০ শতাংশ ক্ষেত্র বিশেষে ১০ দিনের বা তারও কম সময়ের জন্য মজুদ রাখা হয়েছে যা দিয়ে  ১০ দিনের যুদ্ধ চালানো যেতে পারে।এতে কামান এবং ট্যাংকের দুই ধরণের গোলা মজুদ ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। গোলাবারুদের এ ঘাটতিকে বিপদজনক হিসেবে তুলে ধরেছেন ভারতীয় বিশ্লেষকরা। তারা আশংকা ব্যক্ত করে বলছেন, এতে দেশটির সেনা সদস্যদের প্রশিক্ষণ মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে

chinese intrusions.
ভারত-সিকিম-ভুটান-চীন সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত অঞ্চলের ডোকালাম।

এদিকে চীন বলেছে ভারত যদি সিকিমে সেনা পাঠিয়ে ডোকালাম সীমান্ত বিতর্কে নাক গলাতে পারে তবে চীনা আর্মিও কাশ্মীরে ঢুকে পড়তে পারে। এমন কথা বলেছেন একজন চীনা সমর বিশেষজ্ঞ লং জিংচুন। চীনের বক্তব্য, ডোকালাম সমিান্ত তাদের এলাকা। চায়না ওয়েস্ট নর্মাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইন্ডিয়ান স্টাডিজের ডিরেক্টর লং জিংচুন সম্প্রতি ভারত-চীন অশান্তির দায় পুরোপুরি চাপিয়েছেন দিল্লির ঘাড়ে। তাঁর বক্তব্য, ভারত যদি ভুটানের অনুরোধে ভুটান-সিকিম এলাকায় ঢুকে পড়তে পারে, তাহলে পাকিস্তানের অনুরোধে বেইজিংও কাশ্মীরে ঢুকে যেতে পারে। যদিও চীন কাশ্মীর সমস্যায় নাক গলাচ্ছে না।তবে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের রাস্তাঘাট,পরিকাঠামোও তৈরি করছে। চীন-পাকিস্তান যে ইকোনমিক করিডোর তারা তৈরি করছে, তাও যাচ্ছে অধিকৃত কাশ্মীরের ওপর দিয়ে।ভারত,দক্ষিণ এশিয়ার ছোট ছোট দেশগুলোর উপর ‘দাদাগিরি’ করে আসছে দীর্ঘ দিন ধরে। অন্যের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলাচ্ছে। পশ্চিমী দেশ ও তাদের সংবাদমাধ্যম দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ‘দাদাগিরি’ নিয়ে যে মুখ খুলছে না। ভারত দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সমতা ও অন্যের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক না গলানোর পক্ষে সওয়াল করেছে। ভারত নিজে দক্ষিণ এশিয়ায় আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করছে যা জাতিসংঘ সনদের বিরোধী।নেপাল ও ভুটানে বহু ভারতীয় বসবাস করেন, ভারত ওইসব দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলান। তাই তাঁর উপদেশ,নেপাল ও ভুটানের প্রথম চ্যালেঞ্জ হল, যাতে তারা সিকিমের মত ভারতের অঙ্গরাজ্য না হয়ে ওঠে সে বিষয়টা নিশ্চিত করা ও নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।