উচ্চ শিক্ষায় অবহেলিত বাংলাভাষা

443

প্রফেসর আলহাজ্ব মুহাম্মাদ মাসউদুর রহমানঃ

মা’ মাতৃভাষা’ মাতৃভূমি’ পরম পূজনীয় (ড. মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ), আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।মাতৃভাষার দাবীতে জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশ। পেয়েছে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত হয়েছে বিশ্বের দরবারে। পরবর্তীতে এভাষা জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষাহিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এ মুহূর্তে বাংলাকে জাতিসংঘের অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিকে সমর্থন দিতে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সেদেশের পার্লামেন্ট। এতকিছুর পরও নিজদেশেই প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত অবহেলিত, পদদলিত বাংলাভাষা । ইউরোপ এবং আমেরিকায় শিশুর প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা মাতৃভাষার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়ে থাকে। শিক্ষার্থীরা হাইস্কুলে গিয়ে যেকোন একটি বিদেশী ভাষা নিয়ে থাকে। অথচ আমাদের দেশে সরকারী পর্যায়েও ইংরেজিকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর বেসরকারী পর্যায়ে ইংরেজী ভাষার দৌরাত্ম গ্রামেও ধাক্কা লাগিয়েছে। এইসব শিক্ষার্থীরা হিন্দী চ্যানেলের সুবাদে ঘরে ভাইবোন পরস্পরের মধ্যে হিন্দীভাষা ও ডোরিমনে’র ভাষায় কথা বলছে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলাভাষা প্রচন্ডভাবে অবহেলিত পর্যায় রয়েছে। দেশে প্রায় একশরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে অনার্স ও মাষ্টার্স কোসটি রয়েছে মাত্র কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্ত তাও নামে মাত্র। সেখানে এসে অবাধে ভর্তি হচ্ছে সেইসব স্কুলশিক্ষক যাদের দরকার একটি মাষ্টার্স সার্টিফিকেটের। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে কাগজে কলমে থাকছে ফুলটাইম শিক্ষক, থাকছে না কোন প্রফেসর বা এসোসিয়েট প্রফেসর, উপযুক্ত শিক্ষকের অভাবে কোন গবেষণাধর্মী কাজ হচ্ছে না। সুতরাং আমরা সতর্ক না হলে ভবষ্যিতে কোন সাহিত্যিক বা সমালেচক পাচ্ছি না। ক একটি বিশ্ববিদ্যালয় ‘বাংলাদেশ স্টাডিজ’ বলে ১০০ নম্বরের কোর্স পড়ানো হচ্ছে। দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করলে এই পরিমাণ নিতান্তই সামান্য। উচ্চশিক্ষায় ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ কোর্সের অভাবে আমরা আজকে একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট জাতিতে পরিণত হয়েছি। আমরা শিক্ষার্থীদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। আমরা আমাদের স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছি। আমরা আয়নায় নিজেদের মুখটি আর চিনতে পারছিনা। আজকাল ঢাকা শহর বিল্ডিংয়ের আড়ালে ও বিলবোর্ডের কারনে আকাশটিও ঢেকে পড়বার যোগাড়। আমরা বাংলা ভাষানিয়ে এতই হীনতায় ভুগি যে, এগুলোর নেমপ্লেট দেখলেই তা অনুমিত হয়। বিল্ডিংয়ের নাম থেকে শুরু করে বাসা, রাস্তা, ব্লকের নম্বর বিলবোর্ড ইত্যাদি ইংরেজীতে না দিলে যেন সম্মান রক্ষা হয় না। আবার আমরা বাংলাভাষা উচ্চারণেও যথেষ্ট সচেতন নই। বাসের গায়ে দেয়ালে পোষ্টার বিলবোর্ড বা প্রচারে যথেষ্ট বানান ভুল দৃষ্টিগোচর হয়।
সংস্কৃতির বাহন হল ভাষা। মাতৃভাষার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি সে দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য। হাজার বছর আগে আমাদের সংস্কৃতি আমাদের ঐতিহ্য কি ছিল তা আমাদের পঠন-পাঠনের মাধ্যমে জানতে হবে। ইংলিশ মিডিয়াম পড়া বাচ্চাদের যথেষ্ঠ নিজভাষা এবং সেখানে নিজ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি কালচার শেখাতে হবে। উচ্চশিক্ষায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনার্স ও মাষ্টার্স কোর্সটি আবশ্যিক করাতে হবে। শিক্ষার্থীদের শেকড়ের সন্ধান দিতে হবে। ব্যবহারিক ভাষার বাইরে যে একটি উচ্চারণগত ব্যাপার আছে সেখানে আমাদের যথেষ্ট মনোযোগী হতে হবে। ভাষা আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের সরণ করতে হবে, জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান সহ যারা বাংলা ভাষা আন্দোলনে অবদান রেখেছেন তাদেরও ইতিহাস পাঠ্যবইয়ের সিলেবাসে অনর্তভুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে এ আন্দোলনের রূপকার সংগঠন তমদ্দুন মজলিসের পরামর্শ নেয়া যেতে পরে। নি¤œ শ্রেনী থেকে শুরু করে উচ্চতর শ্রেণী পর্যন্ত এবং শিক্ষাকে সামগ্রিক আওতায় নিয়ে আসার মাধ্যমেই জাতির উন্নতি ত্বরান্বিত করা সম্ভব।

লেখক: কথা সাহিত্যিক, টিভি ভাষ্যকর, তাকওয়া পাবলিকেশন্স এর প্রকাশক, আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের ট্রেজারার ও গবেষক: বাংলাভাষা ও সাহিত্যে ইসলামের অবদান।

প্রফেসর আলহাজ্ব মুহাম্মাদ মাসউদুর রহমান
প্রফেসর আলহাজ্ব মুহাম্মাদ মাসউদুর রহমান